প্রায় নয় বছর আগে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালে চিত্রটা বদলেছে। রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা এখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নয়, নিয়ন্ত্রণ করছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি (এএ)। অথচ নিয়ন্ত্রণ বদলালেও রোহিঙ্গাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। বরং নতুন করে বেড়েছে সমুদ্রপথে পালানোর প্রবণতা, বেড়েছে মৃত্যুও।

এর সর্বশেষ উদাহরণ গত ২৯ জুনের ঘটনা। রাখাইনের সিন তেত মাও এলাকা থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করা দুটি ট্রলারে থাকা প্রায় ৫৩০ রোহিঙ্গা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষকদের আশঙ্কা, উত্তাল বঙ্গোপসাগরে ট্রলার দুটি ডুবে গেছে। যদি সেটিই সত্য হয়, তাহলে এটি হবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা নৌ-দুর্ঘটনাগুলোর একটি।

প্রশ্ন উঠছে—যে রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, সেখান থেকে কীভাবে শত শত মানুষ মানবপাচারকারীদের ট্রলারে উঠে জীবন বাজি রেখে দেশ ছাড়ছে? কেন তারা নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েও বঙ্গোপসাগরে নামতে বাধ্য হচ্ছে?

মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করা দুটি নৌকায় থাকা প্রায় ৫৩০ জন রোহিঙ্গা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মানবপাচার নেটওয়ার্ক এবং রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

নিয়ন্ত্রণ বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি রোহিঙ্গাদের ভাগ্য

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত কয়েক বছরে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তন এসেছে। দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের পর বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে আরাকান আর্মি রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। বর্তমানে সিতওয়ে ছাড়া রাজ্যের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ জনপদে তাদের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের জন্য সেই পরিবর্তন স্বস্তি নিয়ে আসেনি।

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের চলাচলে বাধা, জোরপূর্বক নিয়োগ, আটক, নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

ফলে রোহিঙ্গাদের সামনে দুটি পথই খোলা—যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইনে অনিশ্চিত জীবন অথবা মানবপাচারকারীদের ট্রলারে চেপে মৃত্যুঝুঁকির সমুদ্রযাত্রা।

কেন জীবন বাজি রেখে সাগর পথে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা?

রোহিঙ্গাদের সমুদ্রযাত্রার পেছনে কাজ করছে একাধিক সংকট।

রাখাইনে যুদ্ধ, নাগরিকত্বহীনতা, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তাহীনতা যেমন একটি কারণ, তেমনি বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তাও বড় ভূমিকা রাখছে।

কক্সবাজারের বিশাল আশ্রয় শিবিরে এক লাখ নয়, প্রায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বছরের পর বছর বসবাস করছে। সীমিত সহায়তা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই বিকল্প পথ খুঁজছেন।

এই হতাশাকে কাজে লাগাচ্ছে মানবপাচারকারী চক্র।

আরাকান আর্মির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীরা বলছেন, রাখাইনের যেসব এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, সেখান থেকেই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পালিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—কেন নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তারা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে পারছে না?

আরও প্রশ্ন উঠছে, যেসব এলাকা থেকে নিয়মিত মানবপাচারের ট্রলার ছাড়ছে, সেখানে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিগুলোর নজর এড়িয়ে কীভাবে এই কার্যক্রম চলতে পারছে।

আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গাদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা অব্যাহত থাকায় তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা বাড়ছে।

মৃত্যুর রুট: রাখাইন থেকে মালয়েশিয়া

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশ ও রাখাইন উপকূল থেকে পরিচালিত মানবপাচার নেটওয়ার্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সক্রিয়।

রোহিঙ্গাদের অবৈধ সমুদ্রযাত্রার রুট এখন একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বলে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন।

পাচারকারীরা সাধারণত পুরোনো মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে। ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি মানুষ তুলে এসব নৌকা গভীর সমুদ্রে পাঠানো হয়।

অনেক ক্ষেত্রে বড় জাহাজ বা ‘মাদার শিপ’-এর মাধ্যমে যাত্রী স্থানান্তর করা হয়। এরপর থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া হয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়।

এই যাত্রার জন্য পরিবারগুলোর কাছ থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত নেওয়া হয়। অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে জিম্মি করে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

সাগরে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা: ১০ বছরে সাড়ে ৪ হাজার প্রাণহানি

রোহিঙ্গাদের জন্য বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন রুটে পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সাড়ে চার হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। অনেক নৌকাডুবির ঘটনা কখনোই নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে যাত্রা করা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জন নিহত বা নিখোঁজ হন, যা ওই রুটে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একই বছরে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি রোহিঙ্গা এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার চেষ্টা করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতদিন পর্যন্ত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত না হবে, ততদিন বঙ্গোপসাগর মানবপাচারকারীদের জন্য লাভজনক রুট এবং রোহিঙ্গাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়েই থাকবে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মানবপাচারকারী গ্রেপ্তার করে এই সংকটের সমাধান হবে না। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন, রাখাইনে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং নিয়ন্ত্রণকারী সব পক্ষের জবাবদিহি ছাড়া এই মৃত্যুযাত্রা থামানো সম্ভব নয়।

নইলে বঙ্গোপসাগর আরও বহু নিরীহ রোহিঙ্গার শেষ আশ্রয় হয়ে থাকবে, আর প্রতি বছরই নতুন নতুন ট্রলার নিখোঁজ হওয়ার খবর বিশ্বকে নাড়া দিয়ে যাবে।