পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও সামনে এসেছে বিপরীতমুখী দুই দাবি। একদিকে বাংলাদেশ সরকার বলছে, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি পুরোপুরি, ৩টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকি ৪টি ধারা বাস্তবায়নাধীন। অন্যদিকে চুক্তির অন্যতম পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) দাবি করছে, ২৯ বছরেও চুক্তির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ধারা বাস্তবায়িত হয়নি।
এই ভিন্নমতের কারণেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- পার্বত্য শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র কী?
সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের আদিবাসী-সংক্রান্ত স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল জানায়, শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি সম্পূর্ণ এবং ৩টি আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকি চারটি ধারা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান অধিবেশনে বলেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। সরকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল সংযোগ, জীবিকার উন্নয়ন এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তিনি জানান, সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় ক্ষুদ্র-জাতিগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং পার্বত্য এলাকায় ২০ লাখ বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারের এই দাবির সঙ্গে একমত নয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। সংগঠনটি তাদের ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির অর্ধবার্ষিক (জানুয়ারি-জুন ২০২৬)’ প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ক্ষমতায় আসার চার মাস পার হলেও বর্তমান বিএনপি সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
জেএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে ফ্যাসিবাদী কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের নীতি অব্যাহত রেখেছে।
বাস্তবতা হচ্ছে, ১৯৯৭ সালে চুক্তির সময়ে লংমার্চের মাধ্যমে বিরোধিতা করলেও ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি বাতিল করেনি। বরং- বিএনপি পরবর্তীতে চুক্তি বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগ হস্তান্তরে ভূমিকা রেখেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণগুলোতে উল্লেখ করা হয়।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে পার্বত্যবাসীর নিরাপত্তা, অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিএনপির প্রধান দিকগুলো ছিল-
শান্তিচুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কার: চুক্তি বাতিল না করে সকল জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।
অধিকার ও নিরাপত্তা সুরক্ষা: বাঙালি ও পাহাড়ি উভয় জনগোষ্ঠীর জানমালের নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
জীবনমান উন্নয়ন: পার্বত্য অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নে হাসপাতালসহ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষমতায়ন: স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকারের প্রথম অর্থ বিল-২০২৬ পাসের মাধ্যমে পার্বত্য তিন জেলা এবং সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান করসুবিধা আরও সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত আয়ের পাশাপাশি তাদের বেতনভিত্তিক আয়ও করমুক্ত থাকবে। বিশ্লেষকরা সরকারের এসব আর্থিক সুবিধা ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগকে চুক্তি বাস্তবায়নের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক হিসেবেই মনে করছেন।
শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন কেন?
প্রায় তিন দশক পরও চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকায় বিষয়টি এখনও পাহাড়ের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ইস্যুগুলোর একটি। বিশেষ করে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর রাজনৈতিক অবস্থান ও পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এই প্রশ্নকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।
সাংবাদিক গোলাম যাকারিয়ার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্নটি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) রাজনৈতিক অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘদিন ধরে দলটি শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নকে তাদের প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে সামনে রেখে সংগঠন পরিচালনা করেছে। ফলে চুক্তিটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে, কিংবা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি আর রাজনৈতিক আন্দোলনের বিষয় নয়- এমন জনধারণা তৈরি হলে জেএসএসের সামনে নতুন কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক ইস্যু দাঁড় করানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে সংগঠনটির রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা, মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা এবং নেতৃত্বের প্রভাব- সবকিছুই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি আরও মনে করেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন জেএসএসের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক দাবি নয়; এটি সংগঠনের সাংগঠনিক ভিত্তি, জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক বৈধতা ধরে রাখার অন্যতম কৌশল। কারণ, তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ ঐতিহাসিকভাবে শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে এসেছে এবং বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। ফলে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্নটি যত বেশি আলোচনায় থাকবে এবং আন্দোলন যত বেশি সক্রিয় থাকবে, ততই জেএসএস নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থানকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে এবং পাহাড়ে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে পারবে।
গোলাম যাকারিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণেই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দাবিকে ঘিরে প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্য কিংবা সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টির উদ্যোগকে কেবল অধিকার আদায়ের আন্দোলন হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি ধরা পড়ে না। এগুলোর সঙ্গে পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, নেতৃত্বের প্রভাব ধরে রাখার কৌশল এবং সংগঠনগত অস্তিত্বের প্রশ্নও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর মতে, এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে শান্তিচুক্তি ইস্যু কেন তিন দশক পরও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় হিসেবে টিকে আছে, সেটি আরও স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়।


