ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ব্যস্ততা। গ্রামের প্রতিটি উঠান থেকে একে একে বেরিয়ে আসে গরুর পাল। কারো হাতে লাঠি, কারো কাঁধে দড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই গরুগুলো হারিয়ে যায় গারো পাহাড়ের বিস্তীর্ণ সবুজ ঢালে। সারাদিন প্রাকৃতিক ঘাস, লতাপাতা আর ঝোপঝাড় খেয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসে খামারে। এই সহজ ব্যবস্থাকেই পুঁজি করে সীমান্তের শতাধিক পরিবার গড়ে তুলেছে স্বাবলম্বিতার গল্প।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী উপজেলার গারো পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় দেশি গরু পালন এখন আর শুধু পারিবারিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি হয়ে উঠেছে লাভজনক একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। পাহাড়ের প্রাকৃতিক চারণভূমি থাকায় গরুর খাবারের জন্য অতিরিক্ত খরচ করতে হয় না। ফলে কম বিনিয়োগেই মিলছে ভালো মুনাফা।
ঝিনাইগাতীর গান্দিগাঁও গ্রামের এক খামারি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। ছোট পরিসরে শুরু করলেও এখন তার খামারে রয়েছে অনেক গরু।
ওই খামারি বলেন, ‘পাহাড়ই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। গরুগুলো সারাদিন পাহাড়ে চরে, আমরা শুধু সকালে ছেড়ে দিই আর বিকেলে ফিরিয়ে আনি। খাবারের খরচ নেই বললেই চলে। তাই লাভও ভালো হয়।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে অনেকেই মৌসুমি কৃষিকাজ কিংবা দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন গরু পালনই অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। প্রতিবছর কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশি গরুর চাহিদা বাড়ায় খামারিরাও ভালো দাম পান।
প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে গড়ে ওঠা এই খামারগুলো শুধু গরু নয়, লালন করছে সীমান্তের মানুষের স্বপ্নও। পাহাড়ের সবুজ ঢালে প্রতিদিন যে গরুর পাল নেমে আসে, তার সঙ্গে নেমে আসে নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশা। গারো পাহাড় তাই আজ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি হয়ে উঠেছে সংগ্রাম, পরিশ্রম এবং স্বাবলম্বিতার এক অনন্য গল্প।
নালিতাবাড়ীর দাওধারা-কাটাবাড়ি গ্রামের খামারিদের তথ্যমতে, পাহাড়ের ঘাসে বড় হওয়া গরু শক্তপোক্ত হয়। বাজারেও দেশি গরুর আলাদা কদরও আছে।
তবে জানা গেছে, কৃষিকাজের পাশাপাশি গরু পালন করেই তারা বাড়তি আয় করছেন। তবে বর্ষাকালে বন্য হাতির উপদ্রব এবং দুর্গম এলাকায় পশুচিকিৎসা পাওয়া বড় সমস্যা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গারো পাহাড়ঘেঁষা অন্তত ১২ থেকে ১৫টি গ্রামের শতাধিক খামারি এই পদ্ধতিতে গরু পালন করছেন। কারো খামারে ৭-৮টি, আবার কারো খামারে ৫০টিরও বেশি গরু রয়েছে। গরু কেনাবেচা, পরিবহন এবং খামার পরিচর্যাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ দেশি গরু পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তবে এই সম্ভাবনাকে আরও কাজে লাগাতে নিয়মিত পশুচিকিৎসা, টিকাদান, সহজ ঋণ এবং বাজারজাতকরণে সরকারি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।


