টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের জনজীবন। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবানসহ পাহাড়ি জেলাগুলোতে বহু মানুষ পানিবন্দী, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশে মৃতের সংখ্যা ৪৪ জনে পৌঁছেছে, আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০ লাখ।
এই সংকটের সময়ে পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যবেক্ষকদের অনেকে বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় জেএসএস ও ইউপিডিএফের শীর্ষ নেতাদের দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে তেমন দৃশ্যমানভাবে দেখা যাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের একটি অংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর সঙ্গে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাত অবসান ও পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।
চুক্তির বিরোধিতা করে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ আত্মপ্রকাশ করে। সংগঠনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
পরবর্তীতে পিসিজেএসএসের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্য দিয়ে ২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) নামে আরেকটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। অন্যদিকে, ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে আত্মপ্রকাশ করে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে সাবেক ইউপিডিএফ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মার নেতৃত্বে সংগঠনটি গঠিত হয়।
তবে এই দুর্যোগের সময় ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার কার্যক্রম কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে এসব সংগঠনের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের কার্যক্রম চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের একাংশের। তাদের প্রশ্ন, পাহাড়ের মানুষের কল্যাণ ও অধিকার নিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন, সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের পাশে তাদের উপস্থিতি কতটা?
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্তমানে দুর্গত এলাকার মানুষ নিজেদের উদ্যোগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন থাকলেও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মানবিক তৎপরতা তেমন দৃশ্যমান নয় বলে মনে করছেন তারা।
মাঠে প্রশাসন ও সেনাবাহিনী
অন্যদিকে, বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসা সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় সেনাবাহিনী খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।
আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের উদ্যোগে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও বোয়ালখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ এবং বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

দুর্গম এলাকায় উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও দুর্যোগের সময়ে তাদের মানবিক কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা শোনা যাচ্ছে।
শান্তিচুক্তির ২৮ বছর ও প্রত্যাশা
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের উন্নয়ন ছিল এ চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য।
তবে চুক্তির ২৮ বছর পরও এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। পিসিজেএসএসের দাবি, চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন হয়েছে এবং পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে।
শান্তিচুক্তির আগে সরকারের সঙ্গে পিসিজেএসএসের আলোচনা শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে। ১৯৮৫ সালের ২১ অক্টোবর তৎকালীন এরশাদ সরকারের সময়ে আলোচনা প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের আমলেও আলোচনা অব্যাহত থাকে। কয়েক দফা বৈঠকের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
রাজনৈতিক দাবি বনাম মানবিক দায়িত্ব
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে শান্তিচুক্তি, ভূমি সমস্যা, আঞ্চলিক ক্ষমতায়ন ও সাংস্কৃতিক অধিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব ইস্যুতে জেএসএস ও ইউপিডিএফসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে আসছে।
তবে স্থানীয়দের একটি অংশের প্রশ্ন, রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি দুর্যোগের মতো মানবিক সংকটে মানুষের পাশে থাকা কি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অন্যতম দায়িত্ব নয়?
তাদের মতে, পাহাড়ের মানুষের জন্য কাজ করার দাবি করা সংগঠনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নয়, সংকটের সময়ে বাস্তব উপস্থিতির ওপরও।


