খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ডাকবাংলা এলাকায় সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যার ৪০ বছর পূর্ণ হলো আজ সোমবার (১৩ জুলাই)। ১৯৮৬ সালের এই দিনে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের। চার দশক পেরিয়ে গেলেও স্বজন হারানোর বেদনা যেমন মুছে যায়নি, তেমনি পূরণ হয়নি তাদের দীর্ঘদিনের দাবি—ঘটনার সরকারি স্বীকৃতি, গণকবর সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন।

সময় যত গড়িয়েছে, পাতাছড়ার মানুষের বুকে জমে থাকা সেই ক্ষত যেন আরও গভীর হয়েছে। ৪০ বছর পরও প্রিয়জন হারানোর কষ্ট ভুলতে পারেননি তারা। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ মা, কেউ ভাই-বোন, আবার কেউ হারিয়েছেন পরিবারের ছোট্ট সদস্যকে। প্রতি বছর ১৩ জুলাই নিহতদের স্বজনরা গণকবরের পাশে এসে তাদের স্মরণ করেন, দোয়া করেন এবং সেই ভয়াল দিনের স্মৃতিচারণ করেন।

রক্তাক্ত সেই ১৩ জুলাই

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের ১৩ জুলাই পাতাছড়া ডাকবাংলা এলাকায় সংঘটিত হয় ভয়াবহ সশস্ত্র হামলা। তৎকালীন সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনীর হামলায় নারী ও শিশুসহ কয়েকজন নিরীহ বাঙালি মুসলিম নিহত হন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।

হামলার পর পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। জীবন বাঁচাতে অনেক পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিনের হামলা ছিল আকস্মিক ও ভয়াবহ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়দের সহায়তায় নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে একটি গণকবরে দাফন করা হয়।

নিহতদের স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, ওই ঘটনার পর অনেক পরিবার আর নিজেদের বসতভিটায় ফিরতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে তারা বাস্তুচ্যুত জীবন কাটাচ্ছেন। হারানো ঘরবাড়ি, জমি ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা আজও তাদের মধ্যে রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সেই ভয়াবহ দিন

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, সেদিন সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে হঠাৎ করে অস্ত্রধারীরা এলাকায় প্রবেশ করে। মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হয় হামলা। আতঙ্কে মানুষ দিকবিদিক ছুটতে থাকে। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও নির্মমতার হাত থেকে সবাইকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষায়, সেই দিনের কান্না, আর্তনাদ ও আগুনের ভয়াবহ দৃশ্য আজও তাদের চোখে ভাসে। স্বজন হারানোর সেই শোক চার দশক পরও তাদের জীবন থেকে মুছে যায়নি।

স্থানীয়দের দাবি, হামলার দিন সকালে কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে এলাকায় দেখা গিয়েছিল। পরে বিকেলের দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনও সেই দিনের স্মৃতি মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর ফিরে যাওয়ার আকুতি

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, হামলার পর আতঙ্কে শতাধিক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে অনেকে নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসার চেষ্টা করলেও নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ চার দশক ধরে তারা নিজেদের ভূমি ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তারা সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন।

গণকবর সংরক্ষণ ও স্বীকৃতির দাবি

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগে নিজেদের উদ্যোগে পাতাছড়া ডাকবাংলা এলাকার গণকবরটি সংস্কার করা হয়েছে। সেখানে ১৯৮৬ সালের ঘটনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরে একটি সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছে।

তাদের দাবি, গণকবরটি সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে। একই সঙ্গে পাতাছড়া গণহত্যার ঘটনা সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি যথাযথ সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, একটি জনপদের ইতিহাস শুধু স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সঠিকভাবে ইতিহাস সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অতীতের ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানতে পারবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারের পথ তৈরি হবে।

চার দশক পরও শেষ হয়নি অপেক্ষা

পাতাছড়ার গণকবর আজও নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে চার দশক আগের সেই ভয়াবহ দিনের। প্রতি বছর ১৩ জুলাই নিহতদের স্বজনরা সেখানে উপস্থিত হয়ে চোখের পানি ফেলেন, দোয়া করেন এবং হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মরণ করেন।

নিহত পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা, একদিন পাতাছড়া গণহত্যা যথাযথ স্বীকৃতি পাবে, সংরক্ষিত হবে তাদের স্বজনদের স্মৃতি এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো ফিরে পাবে তাদের অধিকার।