২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ সামরিক অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মানবিক বিবেচনায় সীমান্ত খুলে দেওয়ার সেই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হলেও প্রায় এক দশক পর এসে এই সংকট বাংলাদেশের জন্য এক জটিল মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার একটি বড় অংশই শিশু ও কিশোর। নিরাপত্তার আশ্রয় পেলেও শিবিরজীবনে বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের জন্য প্রতিদিনের জীবন এখনো নানা চ্যালেঞ্জে পূর্ণ।
কক্সবাজারের বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিবিরে রোহিঙ্গা নারীরা নিজেদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন এক অনিশ্চিত ও জটিল পরিবেশে তারা বসবাস করছেন, যেখানে নিরাপত্তাহীনতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি এবং সামাজিক চাপ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। অধিকার ও নিরাপত্তার কথা বলতে গিয়ে অনেককেই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রহীন এই জনগোষ্ঠীর নেই কোনো নাগরিক অধিকার, নেই কাজের সুযোগ বা নিয়মিত শিক্ষার নিশ্চয়তা। এমনকি শিবিরের বাইরে যেতে হলেও তাদের নিতে হয় বিশেষ অনুমতি। হতাশা, মানসিক আঘাত এবং অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্যে শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা নারীদের জীবন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
পুরুষদের তুলনায় নারীরা এখানে আরও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। শিক্ষা, চলাচলের স্বাধীনতা কিংবা শৌচাগারের মতো মৌলিক সেবায় পৌঁছাতেও তারা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। তবুও রক্ষণশীল সামাজিক বাধা অতিক্রম করে কিছু নারী শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে এবং নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনে সচেষ্ট রয়েছেন।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর উদ্যোগে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং নেতৃত্বের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
পোশাক ও সেলাই সহায়তা
শিবিরে অনেক নারী, বিশেষ করে নারী-প্রধান পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় পোশাক তৈরির খরচ বহন করতে পারেন না। এ কারণে তাদের জন্য কাপড় বিতরণের পাশাপাশি সেলাই ব্যয়ের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এতে নারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পোশাক তৈরি করতে পারছেন এবং স্থানীয় দর্জিরাও কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।
সৌর আলোর মাধ্যমে নিরাপত্তা বৃদ্ধি
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, শিবিরে একা চলাচলের ক্ষেত্রে অনেক নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বিশেষ করে রাতের বেলায় শৌচাগার, গোসলখানা কিংবা পানির উৎসে যেতে গিয়ে তারা ঝুঁকির মুখে পড়েন।
এ সমস্যা মোকাবিলায় পরিবারগুলোর মধ্যে সৌরচালিত বাতি বিতরণ এবং শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সৌর আলোকায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে নারীদের চলাচল ও নিরাপত্তাবোধ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
নারীদের মতামতে তৈরি হচ্ছে শৌচাগার
ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে পর্যাপ্ত ও নিরাপদ শৌচাগারের অভাব নারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও হয়রানির আশঙ্কা বাড়ে।
এ কারণে স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সহায়তায় রোহিঙ্গা নারীদের মতামত নিয়ে নতুন নকশার শৌচাগার ও কাপড় ধোয়ার স্থান তৈরি করা হচ্ছে। নারীরা জানিয়েছেন, শৌচাগারে যাতায়াতের পথ যেন আরও গোপনীয় ও নিরাপদ হয়। সেই বিষয়গুলো নকশায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নেতৃত্বে রোহিঙ্গা নারীরা
শিবিরে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত এখনো পুরুষদের হাতেই কেন্দ্রীভূত। তবে পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে নারী গ্রুপ ও নারী-বান্ধব কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে, একে অপরকে সহায়তা করতে এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতামত জানাতে পারছেন। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সামাজিক বৈষম্য রোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রোহিঙ্গা নারীদের ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বের সুযোগ বৃদ্ধি শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনেই পরিবর্তন আনবে না, বরং পুরো সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


