মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। তাদের মতে, নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি এবং ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রোহিঙ্গা যুব নেতৃত্বাধীন সংগঠন কমরেডস অব রোহিঙ্গা ইয়ুথের উপনির্বাহী পরিচালক রো মং মিন শোয়ে জুনিয়র বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের পর আবারও রাখাইন রাজ্যে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে। এতে নতুন করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে।

তিনি বলেন, বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি। এর জবাবে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আরাকান আর্মিকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও সামরিক অভিযান জোরদার করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

চলমান সংঘাতে বহু রোহিঙ্গা গ্রাম যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও সশস্ত্র সংঘর্ষে বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন। একই সঙ্গে হাজার হাজার পরিবার নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকার প্রধান উৎস।

সংঘাতের কারণে অনেক এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও জরুরি ওষুধের সংকট তীব্র হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত বাধা এবং চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মতে, চলমান সংঘাতে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার আশঙ্কা বেড়েছে।

পাশাপাশি সংঘাতের চাপে রোহিঙ্গা তরুণদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দুই পক্ষের সশস্ত্র তৎপরতার মধ্যে পড়ে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়াতে রোহিঙ্গা তরুণদের জোরপূর্বক নিয়োগ করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের সংঘাতের অংশ হতে বাধ্য করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর অভিযোগ, আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক অবস্থান ধরে রাখতে সাধারণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বিভিন্নভাবে চাপের মধ্যে রেখেছে। কিছু এলাকায় রোহিঙ্গা বেসামরিকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়েছেন এবং তাদের নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গা তরুণদের জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীর কাজে ব্যবহার করা এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রোহিঙ্গারা বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন তারাই।

রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা বলছেন, কোনো পক্ষের সামরিক স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী। তারা দাবি করেন, রোহিঙ্গা তরুণদের জোরপূর্বক যেকোনো ধরনের সামরিক সম্পৃক্ততা বন্ধ করতে হবে এবং বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় স্বাধীন মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সশস্ত্র সংঘাত ব্যাপকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সামরিক-নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট বিতর্কিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময় হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার জন্য মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানানো হচ্ছে।

রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতায় থাকা বিচারহীনতার আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে। তাদের দাবি, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারের আওতায় আনতে হবে।

বর্তমানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত শিবির এবং বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে বসবাসরত প্রায় ১.৫ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও বিশুদ্ধ পানির সীমিত সুযোগ নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। নাগরিকত্ব ও সমঅধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।

রোহিঙ্গা অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা জানান, তারা মাঠপর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও নথিভুক্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা, ন্যায়বিচার ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কাজ করছেন।

তাদের মতে, ইন্দোনেশিয়ায় এক রোহিঙ্গা বেঁচে ফেরা ব্যক্তির করা গণহত্যা মামলা আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। তবে শুধু একটি মামলা নয়, ২০১৭ সালের গণহত্যা এবং পরবর্তী সময়ে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সংঘটিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হয় এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়।

তাদের দাবি, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তদন্তে সহযোগিতা, প্রমাণ সংরক্ষণ, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা এবং অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধার এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর পদক্ষেপ এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।