দেশের এক-দশমাংশ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম। এই অঞ্চলের সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে গত ২৯ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকার বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছে পার্বত্য মেলা ও তারুণ্যের উৎসব। পাহাড়ি-বাঙালির মিলনমেলায় পরিণত হওয়া এই আয়োজনে অংশ নিয়েছেন হাজারো দর্শনার্থী। মেলায় পাহাড়ি পণ্য, ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পাহাড়ের সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণরা শুধু জুম চাষ বা উৎসবেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সামাজিক উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। তারুণ্যের এই জাগরণকে প্রতিফলিত করেছে এবারের পার্বত্য মেলা। মেলায় পাহাড়ি-বাঙালির সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার পাশাপাশি পাহাড়ের সৌন্দর্য ও সংস্কৃতিকে সমতলের মানুষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
মেলায় ৮৩টি স্টলে পাহাড়ি পণ্য, হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও খাবারের সমৃদ্ধ সম্ভার উপস্থাপন করা হয়েছে। পাহাড়ি খাবারের স্বাদ নিতে মেলায় ভিড় জমিয়েছেন দর্শনার্থীরা। পাহাড়ি প্রকৃতি, আবহাওয়া ও স্থানীয় উপাদানের মিশ্রণে তৈরি খাবারগুলো স্বাদে ও পুষ্টিতে অনন্য। মেলায় পরিবেশিত হয়েছে বাঁশ দিয়ে তৈরি বাম্বু চিকেন, সিদল শুঁটকি, পাজন, হেবাং, নাপ্পি, শামুকের ঝোলসহ নানা ধরনের পাহাড়ি খাবার। এছাড়াও তুলসীমালা চালের চিকেন বিরিয়ানি, সান্নী পিঠা, কলা পিঠা, কালো বিন্নি চালের পিঠা, লাড্ডু, সিস্টেম, খাংময়, ব্যাম্পো সুট, ইজোর ইত্যাদি পাহাড়ি খাবার দর্শনার্থীদের রসনাবিলাসে মাতিয়ে তুলেছে।
মেলায় পাহাড়ি ফলের সমাহারও ছিল চোখে পড়ার মতো। আম, কলা, পেঁপে, আনারসসহ নানা ধরনের ফল দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করেছে। এছাড়াও সুপেয় আখের রস মেলায় আগতদের তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি স্বাদেও তৃপ্ত করেছে।
খাবারের পাশাপাশি মেলায় সাজানো ছিল পাহাড়ি সংস্কৃতির নানা নিদর্শন। হস্তশিল্প, বুননশিল্প, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যগুলো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করেছে। নকশিকাঁথা, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ডিজাইনের পোশাক ও হস্তশিল্প পণ্য মেলার স্টলগুলোকে সজ্জিত করেছে।
মেলায় পসরা সাজিয়ে বসা এক বিক্রেতা সুবিমল চাকমা বলেন, “এই মেলা পাহাড়ি-বাঙালির মিলনমেলা। এখানে যারা আসেন, তারা পাহাড়ের উৎপাদিত ফল, ফসল ও নানা পণ্য কিনতে পারেন। এই মেলার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি হয়। আমরা চাই এই মেলার সময় আরও বাড়ানো হোক, যাতে আমরা লাভবান হতে পারি এবং ক্রেতারা ঢাকায় বসেই পাহাড়ের পণ্য কিনতে পারেন।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে চার দিনব্যাপী এই মেলার উদ্বোধন করেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। মেলায় রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা থেকে আসা পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পণ্য, ফল ও শস্য প্রদর্শন করেছেন।
পার্বত্য মেলা শুধু একটি খাদ্য বা শিল্পমেলা নয়, এটি পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতিরও প্রতীক। মেলায় আগতরা পাহাড়ি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, যা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহাবস্থানকে শক্তিশালী করছে। মেলার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য ও সম্ভাবনা দেশবাসীর কাছে আরও ব্যাপকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
-পার্বত্য সময়


