জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকার ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন কর্তৃক ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই তদন্ত পরিচালনার জন্য ওএইচসিএইচআরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছে, তারা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির যথাযথ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, এবং সরকারের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিস্তারিত বিবরণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘তৎকালীন সরকার এবং তার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, আওয়ামী লীগ, এর সহিংস গোষ্ঠী ও সংগঠনের সঙ্গে একত্রিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল।’ এতে বলা হয়, কয়েকশত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীকে গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং আটক করার ঘটনা ঘটেছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘বিক্ষোভ চলাকালে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার করা প্রাণঘাতী শটগান ও মেটাল প্যালেটের আঘাতে মারা গেছেন। কয়েক হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন, অনেকে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।’
পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবাদ দমনে ১১,৭০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২-১৩ শতাংশ শিশু ছিল।
ওএইচসিএইচআরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা যৌন ও লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার মাধ্যমে নারীদের টার্গেট করেছে। এ ছাড়া, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের দ্বারা সংঘটিত যৌন নির্যাতনের ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিক্ষোভের সময় সশস্ত্র আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি সংগঠিত দল পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। তারা বিক্ষোভ দমনে সরকারি প্রচেষ্টাকে সহায়তা করেছে এবং বেআইনি সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছে।’ এতে আরও উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা পুলিশের সঙ্গে একত্রিত হয়ে বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করেছে।
পুলিশের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাতিসংঘ জানায়, ৯৫ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সদস্য বিক্ষোভ দমনে অস্ত্র সরবরাহে জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে ১০ জন তৎকালীন সংসদ সদস্য, ১৪ জন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, ১৬ জন যুবলীগ নেতা, ১৬ জন ছাত্রলীগ নেতা এবং সাতজন পুলিশ সদস্য ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০২৩ সালের ১৮ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি কোর কমিটির বৈঠকে বিজিবি কমান্ডারকে দ্রুত প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়।’ পরদিন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিক্ষোভকারীদের হত্যা করার ও হত্যার পর লাশ গুম করার নির্দেশ দেন বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার জন্য আমরা কাজ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে সকল নাগরিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন। তাই বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রধান উপদেষ্টা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্টদের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যারা আইন লঙ্ঘন করেছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।’

-পার্বত্য সময়