বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক অনন্য নক্ষত্রের বিদায়ের ১৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং শিক্ষক ড. হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (১৯ জুলাই)। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে কোলন ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে ৬৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। মেধাবী এই শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও খুব দ্রুতই বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন ধারার সূচনা হয়। সহজ, সাবলীল অথচ গভীর মানবিক ভাষাশৈলীর মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, একাকিত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, স্বপ্ন ও জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। মানুষের জীবনই সবচেয়ে বড় গল্প—এই বিশ্বাস থেকেই তার সৃষ্টির মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে।
উপন্যাস, ছোটগল্প, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, শিশুতোষ সাহিত্য, নাটক, গান এবং চলচ্চিত্র—সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় ছিল তার সমান বিচরণ। তার রচিত অসংখ্য উপন্যাস ও নাটক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি করা চরিত্রগুলোর মধ্যে হলুদ পাঞ্জাবি পরা ভবঘুরে ‘হিমু’, যুক্তিনির্ভর রহস্য অনুসন্ধানী ‘মিসির আলী’, নির্মল ব্যক্তিত্বের ‘শুভ্র’ এবং নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র ‘বাকের ভাই’ বাংলা সাহিত্য ও নাট্যাঙ্গনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব চরিত্র সমান জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি ছিলেন সমান সফল। তার নির্মিত নাটক ও চলচ্চিত্র দর্শকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বাংলা বইয়ের বাজারে পাঠক তৈরির ক্ষেত্রেও তার অবদান বিশেষভাবে স্বীকৃত। নতুন বই প্রকাশের সময় বইমেলায় তার বই সংগ্রহে পাঠকদের দীর্ঘ সারি ছিল এক সময়ের পরিচিত দৃশ্য।
প্রকৃতির প্রতি ছিল তার গভীর ভালোবাসা। শহরের কোলাহল থেকে দূরে গাজীপুরের পিরুজালীতে তিনি গড়ে তোলেন নিজের স্বপ্নের আশ্রয় ‘নুহাশ পল্লী’। দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির গাছপালায় ঘেরা এই স্থানটি ছিল তার লেখালেখি, নির্মাণকাজ এবং অবসরের প্রিয় ঠিকানা। মৃত্যুর পর তার ইচ্ছা অনুযায়ী নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় তাকে সমাহিত করা হয়।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ নুহাশ পল্লীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার পরিবার, ভক্ত-অনুরাগী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দোয়া, স্মরণসভা, আলোচনা, ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন ও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তাকে স্মরণ করছে।
জনপ্রিয়তা ও সাহিত্যমান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই—বাংলা ভাষায় নতুন প্রজন্মের পাঠক তৈরিতে হুমায়ূন আহমেদের ভূমিকা ছিল অসামান্য। তিনি সাহিত্যে এমন এক সহজ অথচ গভীর ভাষার প্রয়োগ করেছিলেন, যা বইকে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে।
প্রয়াণের ১৪ বছর পরও তার বই সমান আগ্রহে পড়ছেন পাঠক, টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছে তার নাটক, আর নতুন প্রজন্ম পরিচিত হচ্ছে হিমু, মিসির আলী, শুভ্রসহ তার অমর চরিত্রগুলোর সঙ্গে। সৃষ্টির মধ্য দিয়েই হুমায়ূন আহমেদ আজও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনিবার্য নাম হয়ে আছেন।


