অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে ‘আদিবাসী’ পরিচয় উল্লেখ করে তাদের অধিকারের কথা বলেছিলেন। এ সরকারের বেশির ভাগ উপদেষ্টাও বিভিন্ন সময়ে ‘আদিবাসী’দের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে সম্প্রতি ‘আদিবাসী’দের সঙ্গে যেসব ঘটনা ঘটছে, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য আসেনি। এই প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ ফোরামের আয়োজিত এক গণসমাবেশে বক্তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘আদিবাসী’ ইস্যুতে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন।
শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘‘আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি আদায়ে ‘আদিবাসী’দের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম জোরদার করুন’’ শিরোনামে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে ‘আদিবাসী’দের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পাঠ্যপুস্তকে ‘আদিবাসী’ শব্দ পুনর্বহাল এবং গত ১৫ জানুয়ারি ‘আদিবাসী’ ছাত্র-জনতার ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানানো হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘এই সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের প্রায় সব সদস্যই কোনো না কোনো সময় ‘আদিবাসী’ দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাহলে কেন তাঁরা এখন প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করছেন না? ‘আদিবাসী’ ইস্যুতে সরকারের অবস্থান কী, তা কেন পরিষ্কারভাবে বলা হচ্ছে না?’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তাঁর প্রথম ভাষণে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করে তাদের অধিকারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে তিনি নিশ্চয়ই অবগত। তাহলে কেন তিনি তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করছেন না? সরকার কি পেছনের কোনো শক্তির চাপে নতিস্বীকার করছে?’’
পাঠ্যপুস্তক থেকে ‘আদিবাসী’ শব্দ বাদ দেওয়ার বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘পাঠ্যপুস্তক থেকে যে গ্রাফিতি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনার প্রতীক ছিল। ‘আদিবাসী’ শব্দ মুছে দেওয়ার পেছনে কারা আছেন, তা প্রকাশ করতে হবে।’’
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশন গঠন করা হচ্ছে, কিন্তু ‘আদিবাসী’দের মতামত কীভাবে সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে কোনো আলাদা কমিশন গঠন করা হয়নি। সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি মেনে নেওয়া হয়নি, সংবিধান সংস্কার কমিশনেও ‘আদিবাসী’দের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। তাহলে তাদের মতামতের প্রতিফলন কীভাবে হবে?’’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে অত্যাচার শুরু হয়েছে। সেখানে যে বাহিনী রাজত্ব করে, তাদের নতুন চেহারা দেখা যাচ্ছে। অভ্যুত্থানের পর যে গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল, তা থেকে ‘আদিবাসী’ শব্দ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দায়িত্ব যারা নিয়েছেন, তাদের নাম প্রকাশ করতে হবে।’’
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘‘আগে স্বৈরাচার সরকার আমাদের ‘আদিবাসী’ বলতে দেয়নি। এখনো কি একই অবস্থা চলবে? কোনো একটি গ্রুপের চাপে এনসিটিবি গ্রাফিতি বাদ দিয়েছে। সরকার হামলাকারীদের ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পালন করছে না।’’
গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হোসেন রুবেল বলেন, ‘‘আদিবাসীদের আওয়াজ উঁচু করতে হবে। আওয়াজ যত জোরালো হবে, অন্য পক্ষ তত আমাদের কথা শুনতে বাধ্য হবে। স্বীকৃতি ও অধিকার আদায় করতে হলে আওয়াজ উঁচু করেই এগোতে হবে।’’
মতিঝিলে এনসিটিবি ভবনের সামনে হামলায় গুরুতর আহত রূপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘‘তারা আমাদের নিঃশেষ করতে চায়। আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে সবাইকে এই লড়াইয়ে শামিল হতে হবে।’’
অন্য একজন আহত ডন যেত্রা বলেন, ‘‘যতই অন্যায়-অবিচার হোক, আমরা রক্ত দিয়েছি এবং আরও দিতেও প্রস্তুত। হয়তো রাজপথে মরে যাব, তবু অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব।’’
গণসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহসভাপতি অজয় এম মৃ। সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি বিচিত্রা তির্কী, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিও, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য কে এস মং, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারহা তানজীম, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, আদিবাসী যুব ফোরামের সহসভাপতি টনি চিরান, আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অলিক মৃ প্রমুখ।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইগ্নাসিয়াস হেমন্ত কোড়াইয়া, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক, আদিবাসী ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক গজেন্দ্রনাথ মাহাতো প্রমুখ।

-পার্বত্য সময়