গত এক দশক ধরে রোহিঙ্গা সংকটের ভার বহন করছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের জটিল রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর চাপ ছাড়া এর সমাধান কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

শনিবার (০৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকায় ‘আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলন ও বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশিজ (এনআরবি) এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘১০ বছর হয়ে গেছে, যেটা বাংলাদেশের জন্য একটা বিশাল সমস্যা, বাট ইট ইজ নট বাংলাদেশ’স প্রবলেম। দ্য প্রবলেম ওয়াজ নট ক্রিয়েটেড বাই বাংলাদেশ, দ্যাট ইজ দ্য রোহিঙ্গা ইস্যু।’

তিনি বলেন, ‘এই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও এবার ইউএনজিএ-তে একটা সেশন হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আমরা অনেক কথা বলছি, আদতে এই সমস্যাটা আরও ঘনীভূত হয়েছে।’

এই জটিলতার কারণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেহেতু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সরকার, আরাকান আর্মি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত এবং বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার সেখানে স্বার্থসংশ্লিষ্ট, সে কারণে আঞ্চলিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক চাপ না হলে এ সমস্যার সমাধান করা খুবই কঠিন হয়ে যাবে। সেই জায়গাটাতেও কিন্তু আমি মনে করি, আপনাদের যার যার জায়গা যেখানে যেখানে আছেন, আপনাদের একটা ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি নতুন যাত্রা, নতুন সম্ভাবনা ও নতুন আকাক্সক্ষার প্রতীক।

তিনি জানান, নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন। সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল এবং সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করবেন।

আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন শুরু হতে যাচ্ছে। এবারের অধিবেশনে দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি প্রতিরোধ, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং টেকসই উন্নয়ন অধিকার ঘোষণার ৪০তম বার্ষিকীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।

শামা ওবায়েদ বলেন, এবারের অধিবেশনটি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি তাৎপর্য বহন করছে। কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।

তার এই নির্বাচনকে জাতীয় গৌরবের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাইপ্রাস প্রায় এক দশক ধরে এই পদের জন্য প্রচারণা চালালেও বাংলাদেশ এই সভাপতিত্ব লাভ করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশে বাংলাদেশের ৮৩টি মিশনের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসার কারণেই এই কূটনৈতিক সাফল্য সম্ভব হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনগুলোতে নারীসহ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সাহস, সহনশীলতা ও আত্মত্যাগের কারণে জাতিসংঘে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশেষ সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে আর কেবল বন্যা, দুর্যোগ কিংবা অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর দেশ হিসেবে তুলে ধরা ঠিক হবে না। পর্যটন, ব্যবসা এবং বিনিয়োগে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এবং বিশ্ব মানচিত্রে দেশটিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ আমাদের আছে।

বর্তমান সরকার প্রকৃত সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য সময়ের প্রয়োজন এবং এর জন্য নাগরিক, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহযোগিতা অপরিহার্য।

তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে সঠিক উপায়ে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করছি। সরকার একা সবকিছু করতে পারে না, আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’