কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় টাকার বিনিময়ে স্থানীয়দের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ভাড়া নিয়ে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন করাসহ ভোটার হচ্ছে রোহিঙ্গারা। এর মধ্যে কক্সবাজার পৌরসভায় এবং জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের এ ধরনের প্রতারণায় আশ্রয় নেওয়া অনেকেই শনাক্ত হয়েছেন। তবে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে জানান দায়িত্বশীলরা।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন দালাল এবং পুরাতন রোহিঙ্গা নতুন রোহিঙ্গাদের ভোটার করতে সহযোগিতা দিচ্ছে। কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলীর বাসিন্দা পুরাতন রোহিঙ্গা হাফেজ আহামদের স্ত্রী সনজিদা বেগম জাতীয় পরিচয় পত্র নং ৮৭০৮১৯৫২৩৮। এ জাতীয়পত্র অনুযায়ী তার পিতার নাম আমির হোসেন, মাতার নাম লায়লা বেগম। ঠিকানা বৈদ্যঘোনা। তবে তার আসল পিতার নাম হচ্ছে মৃত লাল মিয়া প্রকাশ নাগু মাতার নাম মমতাজ বেগম। রোহিঙ্গা হওয়ায় প্রকৃত বাবা-মা‘র এনআইডি না থাকায় বৈদ্যঘোনা এলাকার ভিন্ন কাউকে পিতা মাতা সাজিয়ে এনআইডি করেছে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কোনো কথা বলতে রাজি হননি সনজিদা। পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সোহেল সুলতান বলেন,আমার ফুফু মরহুম ফাতেমা বেগম ও ফুফা মরহুম দুদু মিয়াকে পিতামাতা সাজিয়ে ভোটার হয়েছে রোহিঙ্গা খালেদা আক্তার নামের এক মহিলা। তার এনআইডি নাম্বার ১৪৮৫০১৬৯৮২।
আমরা পরে খবর নিয়ে জেনেছি, তার স্বামী শাহিনসহ পুরো পরিবার রোহিঙ্গা। মূলত পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে আমার ফুফু ফুফার মেয়ে সেজে ভোটার হয়েছে খালেদা আক্তার। তবে তার আসল পিতার নাম ইসমাইল ও মাতার নাম নুর বেগম। পাহাড়তলীতে বসবাসকারী রোহিঙ্গা নেতা হাফেজ আহামদ যিনি ইতি পূর্বে পাসপোর্ট করতে গিয়ে ধরা পড়ে জেল খেটেছে তার এনআইডি নাম্বার ৫১০৮১০৯৮৮৮।
এছাড়া পাহাড়তলী এলাকা থেকে ভোটার হয়েছে স্বীকৃত রোহিঙ্গা নুরুল ইসলাম। এনআইডি নাম্বার ১৯৭৯২২২২৪০৭০০০০১২। এই তিন রোহিঙ্গার মতো নানাভাবে জাল-জালিয়াতি করে ভোটার হচ্ছেন মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা।
কক্সবাজার পৌরসভার জন্ম নিবন্ধন, জাতীয়তা সনদ দেওয়ার দায়িত্বে থাকা সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা শামিমা আক্তার বলেন, সম্প্রতি ব্যাপকহারে দেখা যাচ্ছে অনেকে পিতা মাতার এনআইডি আনছে ভুয়া।
যেমন পিতার বয়সের সাথে ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র ১৪ বা ১৫ বছর। অনেকেই দেখা যায়, মায়ের সাথে বয়সের ব্যবধান মাত্র ১০/১২ বছর। পরে ভাল করে যাচাইবাছাই করলে দেখা যায়, এগুলো ভাড়া এনেছে। এরকম অসংখ্য ধরেছি। কিন্তু আইনে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকায় কিছুই করতে পারছি না।
পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা খোরশেদ আলম বলেন, দৈনিক ২০/৩০ জনের মত এরকম ভুয়া আইডি কার্ড নিয়ে জন্ম নিবন্ধন করতে এসে ধরা পড়ছে। মূলত স্থানীয়রা টাকার বিনিময়ে এরকম দেশদ্রোহী কাজ করছে। আবার পুরাতন রোহিঙ্গা ইতিপূর্বে যারা ভোটার হয়ে গেছে তারাও তাদের আত্মীয়-স্বজনকে ভোটার করাতে এনআইডি দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে পিএমখালী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরিফ উল্লাহ বলেন, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এরকম প্রতারণা করতে এসে ধরা পড়ছে। অনেকে চট্টগ্রাম, শরিয়তপুর, ভোলা, নাইক্ষ্যংছড়ির ঠিকানায় পিতা মাতার এনআইডি নিয়ে আসছে। আবার ছেলেমেয়ের জন্ম নিবন্ধন বা স্কুল সার্টিফিকেট কক্সবাজারের। আবার অনেকে সরাসরি ভুয়া এনআইডি যেমন কম্পিউটার থেকে বানিয়ে নিয়ে আসছে। এসব বিষয় নিয়ে খুবই অসুবিধায় আছি।
তার ভাষ্যমতে, ভোটার তালিকা হালনাগাদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন থাকলে ভালো হতো। এ রকম ভুয়া পরিচয়ে আসা রোহিঙ্গা এবং এনআইডি ভাড়া দেওয়া ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা যেত।
একই পরিস্থিতির কথা জানান উখিয়ার জালিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম।
তিনি বলেন, গত সপ্তাহে ভুয়া এনআইডি নিয়ে ভোটার হতে আসা অনেককেই ধরা হয়েছে। কিন্তু কোন আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারিনি। তিনি মনে করেন, ভোটার হতে রোহিঙ্গাদের সহায়তা করা স্থানীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা উচিত।
রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মীর শাহেদুল ইসলাম রোমান বলেন, চাচি শাশুড়িকে মা বানিয়ে কৌশলে বাংলাদেশি নাগরিক বনে যেতে চেয়েছিলেন রোহিঙ্গা যুবক সাহাব উদ্দিন। কাগজপত্র দেখে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাদের দুজনকে আটক করা হয়।
এ সময় জব্দ করা ফাইলে রোহিঙ্গা নয় মর্মে প্রত্যয়নপত্র, চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রত্যয়ন, রাজাপালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজ পাওয়া যায়। প্রত্যেকটিতে স্বাক্ষর দেখা যায়।
খবর নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গা সাহাব উদ্দিনের স্ত্রী খুরশিদা আক্তার রাজাপালং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড উত্তর পুকুরিয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিমের মেয়ে। বেশ কয়েক বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। মা পরিচয় দেওয়া চাচি শাশুড়ির নাম খুরশিদা বেগম। তিনি একই এলাকার মৃত জাফর আলমের স্ত্রী।
জন্মনিবন্ধনের আবেদনপত্রে ব্যবহার করা হয় সাহাব উদ্দিনের শ্যালক সাইফুল ইসলামের ফোন নম্বর। তার মাধ্যমেই এসব কাগজপত্র জোগাড় করেন বলে জানা যায়।
রোহিঙ্গা সাহাব উদ্দিনের ভাষ্যমতে, তার জন্ম বাংলাদেশে। বিয়ে করে সংসারও পেতেছেন এখানে। রাজাপালং ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দরগাহবিলে স্থানীয় ইউপি সদস্য ইকবাল বাহারের সহযোগিতায় বসবাস করছেন। কয়েক যুগ আগে মিয়ানমার থেকে সাহাব উদ্দিনের পরিবার বাংলাদেশে আসে বলে দাবি তার।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও ভোটার করার সহযোগিতা করার বিষয়ে জানতে চাইলে, ইউপি সদস্য ইকবাল বাহার সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোন কেটে দেন।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০২১ সালের ২৮ মার্চ রোহিঙ্গা ভোটার করানোর অভিযোগে দুদকের মামলায় কক্সবাজার পৌরসভার ৩ কাউন্সিলর ও ২ জন পৌরসভার কর্মচারী আটক হয়েছিল। বিভিন্ন সময় আমরা রোহিঙ্গা শনাক্ত করে তাদের এনআইডি বাতিলের জন্য আবেদন করেছি। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থাও নিয়েছে।
কক্সবাজার নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভোটার তালিকা আইন ২০০৯ এর ১৮/১৯ ধারায় জালিয়াতি এবং তথ্য গোপন করায় ২০১৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার শিমুল শর্মা বাদী হয়ে ৫ রোহিঙ্গাসহ অজ্ঞাতনামা বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছিল।
আসামিরা হলেন, কক্সবাজার পৌরসভার পশ্চিম নতুন বাহারছড়ার ইউসুফ আলির ছেলে নুরুল ইসলাম নুরু (৪২), মৃত শহর মুল্লুকের ছেলে ইয়াসিন (৩৭) ও টেকনাফ নয়াপাড়া মুছনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এইচ ব্লকের বাসিন্দা আবুল হাশেমের ছেলে আবদুল্লাহ (৫৩)।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ ফয়সাল আলম বলেন, সঠিক ডকুমেন্ট ছাড়া কোন ভাবেই ভোটার হওয়ার সুযোগ নেই। মূলত কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সমস্যাটা প্রকট। ফাঁকে যদি কেউ তথ্য গোপন করে বা ভুয়া কাগজ দিয়ে ভোটার হয়ে থাকে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে অবশ্যই পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। তবে ডিজিটাল অনলাইন দিচ্ছে এবং নাগরিক সনদ দিতে বেশি সতর্ক থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
-পার্বত্য সময়


