পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সাড়ে চার মাস অতিবাহিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। পক্ষান্তরে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন লঙ্ঘন করে পরিষদগুলোর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাদের পরিষদগুলোর প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের সময় বহিরাগত সেটেলারদেরকে অন্তর্বর্তী পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা পার্বত্য চুক্তির সরাসরি বরখেলাপ। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়নি। বরং রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক আদিবাসী জুম্ম জনগণের ওপর বৈষম্য ও বঞ্চনার স্টিম রোলার অধিকতর জোরদার হয়েছে।
বুধবার (১ জানুয়ারি) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রকাশিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে’ এ তথ্য প্রকাশ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের নাজুক সামগ্রিক পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং আরও অবনতি ঘটেছে। বছরটিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং ভূমিদস্যুদের দ্বারা ২০০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। । এসব ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। এতে ২১ জন নিহত এবং ১১৯টি বাড়ি ও দোকান অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। এছাড়া বহিরাগত কোম্পানি, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সেটেলার কর্তৃক দুই হাজার ৩১৪ একর ভূমি বেদখল করা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের নাজুক সামগ্রিক পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং সার্বিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ২০২৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সবচেয়ে নৃশংস ও লোমহর্ষক ঘটনা হলো গত সেপ্টেম্বরে জুম্ম জনগণের ওপর নৃশংস সাম্প্রদায়িক হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হওয়া এবং ডিসেম্বরে লামায় ত্রিপুরাদের ১৭টি বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে না হতেই এই নৃশংস সাম্প্রদায়িক হামলা হয়। পূর্বের হামলাগুলোর মতো ওই সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের কাউকেই আইনের আওতায় আনা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলন ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের মূল স্পিরিট ছিল বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী এবং জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী রাষ্ট্রীয় নীতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে আগের সরকারগুলোর মতো এখনো জুম্ম জনগণের ওপন দমন-পীড়ন, ভূমি বেদখল ও উচ্ছেদ, সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগ, অনুপ্রবেশ, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনরত জুম্ম জনগণকে ‘সন্ত্রাসী’, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ও ‘অবৈধ অস্ত্রধারী’ হিসেবে তকমা দিয়ে ক্রিমিনালাইজ করা, জুম্ম নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ইত্যাদি মানবতাবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ চরম অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।


