টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে অপহরণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। গত তিন বছরে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছে, আর মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা।
সন্ত্রাসীরা পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা যুবকদের ভাড়া করে তথ্য সংগ্রহের কাজে লাগাচ্ছে। কার বাড়িতে টাকা আছে, কে কোথায় যাচ্ছে—এসব তথ্য চলে যাচ্ছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কাছে, যা পরে অপহরণের কাজে ব্যবহার করা হয়।
অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে মুক্তিপণের টাকা পাহাড়ে পৌঁছে দিতে বাধ্য করা হয়। স্থানীয়রা জানান, অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না, কারণ কিছু অসাধু স্থানীয় ব্যক্তি টাকার বিনিময়ে সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা করছে। তারা খাবার, আসবাবপত্র ও অস্ত্র তৈরির উপকরণ সরবরাহ করছে।
রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা মহেশখালী থেকে অস্ত্র তৈরির কারিগর এনে পাহাড়ে অস্ত্র তৈরি করছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে তারা অপহরণ, মাদক ব্যবসা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
অপহরণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন। তারা টেকনাফের পাহাড়ে সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দোষীদের আইনের আওতায় আনা গেলে অপহরণের হার কমে আসবে।
গত এক বছরে অপহরণের বেশ কয়েকটি বড় ঘটনা ঘটেছে। গত ২৮ এপ্রিল ৯ বছরের শিশু মো. সাইফকে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া হয়। ২১ আগস্ট মোছনী গ্রামের দুদু মিয়ার দুই ছেলে ৫ লাখ টাকা দিয়ে মুক্তি পান। ২৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আতিককে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেতে হয়। ১৬ অক্টোবর ২ কৃষক নুরু ৩ লাখ টাকা দিয়ে মুক্তি পান।
একইভাবে, ২ নভেম্বর ৯ জন অপহৃত ব্যক্তি ৭ লাখ টাকা মুক্তিপণে মুক্তি পান, ৩০ নভেম্বর ৩ শ্রমিককে ৩ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পাওয়া যায়। ৫ ডিসেম্বর ১৮ জনকে অপহরণ করা হয় এবং ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তারা মুক্তি পান।
অপহৃতদের পরিবার জানায়, সন্ত্রাসীরা ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করে, টাকা না দিলে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়। পুলিশের কাছে গেলে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হতে হয় বলে জানিয়েছেন অনেকে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৩০০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৪ জন মুক্তিপণ দিতে না পারায় নিহত হয়েছেন। গত এক বছরে অপহরণের সংখ্যা ১৫০ জন, যার মধ্যে ৯১ জন স্থানীয় ও ৫৯ জন রোহিঙ্গা।
টেকনাফ মডেল থানায় গত এক বছরে ১৯টি অপহরণের মামলা হয়েছে। ৬২ জন অপহৃতের মধ্যে ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২৯ জন অপহরণকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় অভিযানের পাশাপাশি যারা সন্ত্রাসীদের সহায়তা করছে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে টেকনাফের পাহাড়ে অপহরণের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

-পার্বত্য সময়