রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক সামি হামদি। তিনি বলেছেন, কেবল কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। এ জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো প্রয়োজন।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের পদ্মা হলে আয়োজিত ‘মুভ টাউন হল: বিয়ন্ড দ্য ক্যাম্পস-বাংলাদেশ অ্যাজ দ্য আর্কিটেক্ট অব রোহিঙ্গা রিটার্ন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সামি হামদি। হিউম্যান কনসার্ন ইউএসএর অংশীদারত্বে অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়।
সামি হামদি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে রোহিঙ্গা সংকটকে মূলত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মোকাবিলা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ সংকট বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। তাই এখন থেকেই বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক রোডম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘কূটনীতি একা যথেষ্ট নয়।’ শুধু কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো জটিল সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা নিয়ে সামি হামদি বলেন, ভবিষ্যতে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে কোনো আলোচনা হলে সেখানে বাংলাদেশের ভূমিকা কতটা থাকবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এখন থেকেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগতভাবে কাজ না করলে ভবিষ্যতের আলোচনায় নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। উত্তর রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক শান্তিরক্ষী বা নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তুলে ধরেন তিনি।
সামি হামদি বলেন, বাংলাদেশকে শুধু সংকটের বোঝা বহনকারী দেশ হিসেবে না দেখে রোহিঙ্গা সংকটকে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। তার মতে, সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের নতুন করে চিন্তা করার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।
রোহিঙ্গাদের শুধু ‘বোঝা’ হিসেবে দেখার সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাদের শিক্ষা, নেতৃত্বের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মুসলিম এইডের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক এবং ইসলামিক রিলিফ অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাদলুল্লাহ উইলমট। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রয়োজনীয় অর্থ ও সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে শরণার্থী শিবিরগুলোতে শিক্ষা, খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুবিধার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে উল্লেখ করে উইলমট বলেন, তাদের এমন পরিস্থিতিতে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে আবার নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি-নাগরিকত্ব, ক্ষতিপূরণ এবং আইনগত অধিকার। জমি ও সম্পত্তি হারানোর ক্ষতিপূরণ এবং চলাচল, শিক্ষা ও কাজের অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।
রোহিঙ্গা সংকটের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে উইলমট বলেন, মানবিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে শরণার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্ট মাহমুদ হাসান রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, নেতৃত্বের বিকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা শুধু একটি ‘সংকট’ নয়, তারা মানুষ। তাদের ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহমুদ হাসান জানান, ২০১৬ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসেন। পরের বছর তার মা বাংলাদেশে আসেন। মিয়ানমারে শিক্ষার্থী, নেতা, বুদ্ধিজীবী ও অধিকারকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের কারণে তাদের মতো অনেক পরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বলে তিনি জানান।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ভুল ইতিহাস ও নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বহিরাগত হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মাহমুদ হাসান।
রোহিঙ্গা তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত হতে হলে রোহিঙ্গাদের নিজেদের নেতৃত্ব ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব, বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকা, রোহিঙ্গাদের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করেন।


