পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বন্যা পরিস্থিতিতে ত্রাণ কার্যক্রম তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে দেওয়াকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চেতনার পরিপন্থী এবং বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত বলে অভিযোগ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন। সংগঠনটির দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী ওই অঞ্চলের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ রয়েছে, যাদেরকে এ কার্যক্রমে সম্পৃক্তই করা হয়নি।
আজ বুধবার (২৯ জুলাই) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সংগঠনের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে সরকারের পাঁচ মাসের পর্যবেক্ষণে এ অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
সভায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মব সহিংসতা, মাজারে হামলা এবং পার্বত্য অঞ্চলে জাতিগত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ।
তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের এত বছর পরও পাহাড়ে কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভূমির অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
সাইফুল হক বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের জনসংখ্যার কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে বিভিন্ন জাতিসত্তাগুলো নিজ ভূখণ্ডেই আরও গভীর সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীকেও সমাধান প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা যাবে না। তাদের সম্পৃক্ত না করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।’
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে একটি জাতীয় কমিশন গঠন করা উচিত। সেখানে পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিসত্তা, বাঙালি জনগোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ, গবেষক, রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে বাস্তবতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে টেকসই সমাধানের রূপরেখা তৈরি করতে হবে।’
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা কম। ফলে এ সংকট ভবিষ্যতে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা, জনসংখ্যা ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে চুক্তি বাস্তবায়নের রেকর্ড খুব আশাব্যঞ্জক নয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামাজিক চুক্তি সংবিধানের অনেক অঙ্গীকারই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তাই পার্বত্য শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে বহুত্ববাদী সমাজ গঠন, পরিচয়ের বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান এবং পার্বত্য অঞ্চলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার রয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা।
'আদিবাসী' পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের যে পরিচয়ে পরিচিত হতে চায়, সেই আত্মপরিচয়ের অধিকার তাদের রয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের অর্থ চুক্তি বাতিল নয়; বরং কোথায় অগ্রগতি হয়েছে, কোথায় হয়নি এবং কীভাবে কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব, তা বাস্তবতার আলোকে পর্যালোচনা করা।’


