পার্বত্য চট্টগ্রামে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট- ইউপিডিএফ (প্রসীত)। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংগঠনটির পুনরুত্থান, চাঁদাবাজি, সশস্ত্র তৎপরতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি ঘিরে তিন পার্বত্য জেলায় নতুন করে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বে জর্জরিত পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউপিডিএফের নতুন সক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইউপিডিএফ আবারও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার, অর্থ সংগ্রহ এবং নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সংগঠনটি নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং একাধিক সহিংস ঘটনার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় ইউপিডিএফকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
অভিযানের ফলে ইউপিডিএফের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও সংগঠক আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি অংশ দেশ ছেড়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে বলেও আলোচনা রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিরাপত্তা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার দুর্গম এলাকায় ইউপিডিএফের একটি আস্তানা থেকে অস্ত্র, গুলি, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং বিপুল পরিমাণ প্রচারসামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে বলে আইএসপিআর জানিয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে জেএসএস, জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), কেএনএফসহ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী বিভিন্ন মাত্রায় সক্রিয় রয়েছে। অতীতে এসব গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে বহু প্রাণহানি ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্গম সীমান্ত এবং ভারত ও মিয়ানমার সংলগ্ন অবস্থান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করে। সীমান্তবর্তী এলাকায় চাঁদাবাজির বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অস্ত্র চোরাচালান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে ইউপিডিএফের অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টার কথাও উঠে এসেছে।
এদিকে ইউপিডিএফ নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অনেক অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দমন করার জন্য বিভিন্ন সময় অতিরঞ্জিত অভিযোগ আনা হয়। সংগঠনটি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধিতা এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে তুলে ধরে।
তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং চাঁদাবাজি ও অস্ত্র পাচার নেটওয়ার্ক ভাঙার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় ইউপিডিএফসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর পুনরুত্থান ভবিষ্যতে নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে।


