‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে আড়ালে দেশভাগ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চক্রান্ত রোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতি-গোষ্ঠীর (বাঙালিসহ) জন্য সমান কোটা, সমান আয়কর সুবিধা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি), ঢাকা মহানগর শাখা।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পিসিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি রাসেল মাহমুদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল হাসান।

সমাবেশে বক্তারা দাবি করেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরবর্তীতে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের মতে, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

বক্তারা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘদিন ধরে আয়কর অব্যাহতির সুবিধা থাকলেও একই অঞ্চলে বসবাসকারী স্থানীয় বাঙালিরা সেই সুবিধা পান না। এতে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে তারা পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী সকল নাগরিকের জন্য সমান আয়কর নীতি প্রণয়নের দাবি জানান।

সমাবেশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত বিভাগগুলোর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির (১১–২০তম গ্রেড) পদে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কোটা চালুর দাবি জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমিতি, ঢাকার সভাপতি, লেখক ও গবেষক এ এইচ এম ফারুক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং পরবর্তী সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। তার দাবি, পরবর্তীতে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুনভাবে উত্থাপিত হয়েছে এবং এর পেছনে ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

পিসিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আল আমিন বলেন, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণার ভিত্তিতে পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ‘আদি বাসিন্দা’ হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়ে তাদের সংগঠনের ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে অভিবাসনের মাধ্যমে এসব জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেছে। তিনি আরও বলেন, চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের কয়েকজন গবেষকের লেখায়ও এ ধরনের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে রাসেল মাহমুদ বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের পরিচয়-রাজনীতির বিষয়টি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তিনি সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় নীতির আলোকে এ বিষয়ে সমাধানের আহ্বান জানান।

স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির আহ্বায়ক জিয়াউল হক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে, যা তাদের মতে স্ববিরোধী। তিনি জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষায় সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

সমাবেশে অ্যাডভোকেট পারভেজ তালুকদার, পিসিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আহমেদ রাজু, সাংবাদিক ও গবেষক মেহেদী হাসান পলাশ, সিসিসিপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শাহাদাৎ ফরাজি সাকিব, সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের আহ্বায়ক থোয়াই চিংমং শাক, পিসিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আল আমিনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সমাবেশ থেকে তিন দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো—‘আদিবাসী’ শব্দের আড়ালে দেশভাগ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতি-গোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে সমান কোটা নিশ্চিত করা এবং পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী সকল নাগরিকের জন্য বৈষম্যহীন ও সমান আয়কর ব্যবস্থা চালু করা।