পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদ। এছাড়া পার্বত্য চুক্তি বাতিলসহ আদিবাসী ইস্যু নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের দেশের শত্রু আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে বক্তারা।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকাল ১১টা ১৫ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের উদ্যোগে এ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে সমাবেশ শেষে শাহবাগ থেকে একটি মিছিল বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়।

সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মোস্তফা আল ইহযাব, স্টুডেন্ট ফর সভেরেন্টির আহ্বায়ক জিয়াউল হক, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের (পিসিএনপি) কেন্দ্রীয় কমিটির লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট পারভেজ তালুকদার, লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার ফরিদুল আকবর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের (পিসিসিপি) ঢাকা মহানগর শাখার সহ-সভাপতি মো. মিজানুর রহমানসহ প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক।

সমাবেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট পারভেজ তালুকদার বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীর সদস্যরা জীবন দিচ্ছেন। এদিকে সন্তু লারমার পালিত সন্ত্রাসীরা পাহাড় নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তিন পার্বত্য জেলায় উপজাতিদের জন্য আয়কর মওকুফ করেছেন। এটি পার্বত্য এলাকার বাঙালিদের জন্য চরম বৈষম্য ও হতাশার। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই, আমরা সবাই বাংলাদেশি। পার্বত্য চট্টগ্রামে উভয়ের জন্য ট্যাক্স মওকুফ, পার্বত্য চুক্তি বাতিল, হেডম্যান ও রাজার প্রথা বিলুপ্ত, ভূমি সমস্যার সমাধান, সরকারি চাকরিতে কোটা বৈষম্য দূর এবং সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সহ-সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা কঠিন বৈষম্যের শিকার। পার্বত্য এলাকার উপজাতিদের শিক্ষা ও চাকরিতে কোটার সুবিধা থাকলেও বাঙালিদের জন্য কোনো কোটা সুবিধা নেই। তিনি এ কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

স্টুডেন্ট ফর সভেরেন্টির আহ্বায়ক জিয়াউল হক বলেন, বাংলাদেশের এক-দশমাংশ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত। পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে খ্রিস্টান রাষ্ট্র করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ১৮৬০ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল না এবং ব্রিটিশদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম আইন চালু করা হয়। তিনি আরও বলেন, ১৮৬০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে চাকমা, মার্মা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকজনকে সেখানে আনা হয়। ১৯৯৭ সালে দেশবিরোধী একটি চুক্তি করা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিদের জন্য আয়কর মওকুফের সিদ্ধান্তকে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই, সবাই বাংলাদেশি। কিছু এনজিও ও বামপন্থী দালাল চক্রের লোকদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ রোধ করতে হবে।

লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার ফরিদুল আকবর বলেন, ১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়েল বাতিল করা দরকার। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য অনেক কিছু করে গিয়েছেন। বাংলাদেশে আদিবাসী কেউ নেই। নাথান বম নতুন করে কেএনএফ সংগঠন সৃষ্টি করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছে। তিনি দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ৫ হাজার আনসার ভিডিপি সদস্যকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমনে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫৫ বছরে অনেক সরকার ক্ষমতায় এলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য দূর করতে হবে। পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা বাঙালিদের ওপর নির্যাতন করছে। রাঙ্গামাটিতে চাঁদার দাবিতে এক গরিব কৃষকের ৭০০/৮০০ পেঁপে গাছ কেটে ফেলার ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, পাহাড়ে সেনা ক্যাম্প থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না এবং দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিদেশিদের গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। প্রয়োজনে জাতীয় সমাবেশ ডাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশপ্রেমিক ছাড়া সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা যায় না।

সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মোস্তফা আল ইহযাব বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের মতো বাঙালিদের জন্যও আয়কর মওকুফ করতে হবে। এক দেশে দুই নীতি বন্ধ করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, পার্বত্য এলাকায় বাঙালিদের কোনো কাজ করতে হলে উপজাতি সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হয়। সম্প্রতি রাঙ্গামাটিতে চাঁদার দাবিতে নিরীহ কৃষকের ৮০০ পেঁপে গাছ কেটে ফেলার ঘটনাকে তিনি দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, পার্বত্য এলাকার সব সরকারি ও বেসরকারি দপ্তর উপজাতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকারি চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে উপজাতি কোটা বাতিল, আদিবাসী ইস্যু নিয়ে ষড়যন্ত্র বন্ধ এবং বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই—এ দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে সন্তু লারমা, দেবাশীষ রায়, ইয়েন ইয়েন, অগাস্টিনা চাকমা, মাইকেল চাকমা, সুহাষ চাকমা, ড. ইফতেখারুজ্জামান, জাকির হোসেন ও দীপায়ন খীসাসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন এবং তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।