পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে স্থানীয় জনগণের জীবনমানের বাস্তব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর, জনমুখী ও প্রয়োজনভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এমপি।
সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চলমান এবং ‘সবুজ পাতা’য় অন্তর্ভুক্ত উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, বাস্তবায়ন পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় করেন।
প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষি ও জনজীবনে সুপেয় পানির সংকট অন্যতম বড় সমস্যা। তিনি রাঙ্গামাটির একটি দুর্গম এলাকার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে সেখানকার নারীরা প্রায় ১২০০ ফুট নিচে নেমে খাবার পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হতেন। বিষয়টি জানার পর তিনি রাঙ্গামাটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সেই দুর্ভোগ লাঘব করা সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, “অহেতুক অতিরিক্ত প্রকল্প না নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।”
পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি ও ফলভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি অর্গানিক ফলের বাগান বৃদ্ধি, কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ, ফল ও ড্রাই ফ্রুটস প্রসেসিং শিল্প গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৬টি উপজেলার পাড়াকেন্দ্রে নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়াশরুম সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পাড়াকেন্দ্রভিত্তিক বিদ্যালয়গুলোতে মেয়েদের জন্য নিরাপদ, সামাজিক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘মডেল পাড়াকেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
পার্বত্য অঞ্চলে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকের ঘাটতি দূর করতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জোর দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেন্ট্রাল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও রেকর্ড করা পাঠদানের ব্যবস্থা চালু করা গেলে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে। তিনি এ ধরনের উদ্যোগ ‘সবুজ পাতা’ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।
ক্রীড়া উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু জেলা পর্যায়ে নয়, উপজেলা পর্যায়েও খেলার মাঠ ও স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রয়োজন। এতে খেলোয়াড়দের নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত হবে এবং নতুন প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।
সভায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে কোল্ড স্টোরেজ, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ সুপেয় পানি এবং টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তিনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তত পাঁচটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করার অনুরোধ করেন।
সভায় মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন চলমান ও প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল- তুলা চাষ বৃদ্ধি ও কৃষক দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প; রাঙ্গামাটিতে সংযোগ সড়কসহ আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ; ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুড ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট (CRLIWM-CHT) প্রকল্প; টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান (দ্বিতীয় পর্যায়); খাগড়াছড়ির মহালছড়ি-বাঘমারা ও হেমরঞ্জন পাড়া সড়ক নির্মাণ; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প।
এছাড়া ‘সবুজ পাতা’ কর্মসূচির আওতায় বাছাইকৃত ২১টি প্রকল্পের মধ্যে সরকারের বর্তমান ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ১৬টি প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
এসব প্রকল্পের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের জন্য ১২টি প্রকল্পে আনুমানিক ১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা, বান্দরবান জেলা পরিষদের জন্য একটি প্রকল্পে ৪২ কোটি টাকা, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের জন্য চারটি প্রকল্পে ১৯৫ কোটি টাকা এবং খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের জন্য চারটি প্রকল্পে ১৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব নির্ধারণ করা হয়েছে।
সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুল ইসলাম, যুগ্মসচিব মোহাম্মদ মমিনুর রহমান, অতুল সরকার ও কাজী তোফায়েল হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ ছালেহ আহাম্মদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাসহ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


