গোলাম যাকারিয়া

পার্বত্য চট্টগ্রামের সুউচ্চ পাহাড়গুলো আজ আর শুধু প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আধার নয়; বরং তা রূপ নিয়েছে এক বিভীষিকাময় বধ্যভূমিতে। সোমবার (৬ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার পূজগাঙ এলাকার মধুমঙ্গল পাড়ায় প্রকাশ্য দিবালোকে যে ঘটনাটি ঘটল, তা কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়; এটি পার্বত্য অঞ্চলের নির্মম ও নগ্ন বাস্তবতার এক জ্বলন্ত দলিল। কোনো কোনো গণমাধ্যমে খবর- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস (সন্তু) গ্রুপ ছেড়ে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত)-এর মধ্যকার গোলাগুলিতে ৩ জন নিহত। আবার কেউ বলছে- জেএসএস ছেড়ে ইউপিডিএফে যোগ দেওয়ার অপরাধে তিন দলছুট কর্মীকে গুলি করে ঝাঁজরা করে দেওয়া হয়েছে। এই ত্রিপল মার্ডারের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পাহাড়ে মানুষের জীবনের মূল্য আজ কতটা সস্তা এবং সেখানে বন্দুকের নলই কীভাবে শেষ কথা বলে।

পানছড়ির এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দিকে গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিপাত করলে একটি স্পষ্ট ও ভয়াবহ বার্তা দৃশ্যমান হয়। এই খুন যে বা যারাই করুক, তাদের প্রতিপক্ষ এবং নিজেদের কর্মীদের একযোগে কয়েকটি চরম বার্তা দিয়েছে।

প্রথমত, এটি প্রতিপক্ষকে দেওয়া এক চরম চ্যালেঞ্জ। তারা বুঝিয়ে দিল, পাহাড়ে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তারা যেকোনো স্তরের নৃশংসতা প্রদর্শন করতে দ্বিধা করবে না।

দ্বিতীয়ত, এটি নিজেদের দলের ভেতরের সাধারণ কর্মীদের জন্য এক পৈশাচিক হুঁশিয়ারি। বার্তাটি অত্যন্ত পরিষ্কার- ‘দল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বা আমাদের সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে মৃত্যু অনিবার্য; দলত্যাগীদের কোনো ক্ষমা নেই।’

তৃতীয়ত, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি এক বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। দিনের আলোতে, জনসমক্ষে এভাবে ব্রাশফায়ার করে মানুষ হত্যা করার অর্থ হলো- তারা রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন বা বিচারব্যবস্থাকে তোয়াক্কা করে না। এখানে একমাত্র তাদেরই সমান্তরাল শাসন ও রাজত্ব চলবে। এই একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী মানসিকতাই আজ পুরো পার্বত্য অঞ্চলকে এক স্থায়ী অশান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েকদিন আগে, গত ১ জুলাই সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস গত ছয় মাসের (জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৬) একটি তথাকথিত ‘মানবাধিকার প্রতিবেদন’ প্রকাশ করেছে। অত্যন্ত সুচতুরভাবে সাজানো সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সেনা-মদদপুষ্ট সশস্ত্র গ্রুপ, বাঙালি সেটেলার ও ভূমিদস্যুদের দ্বারা ৫৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এবং ১৫৪ জন জুম্ম জনমানুষ এর শিকার হয়েছেন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই ছয় মাসে ১০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পরম আশ্চর্যের বিষয় হলো-জেএসএস-এর নিজেদের তৈরিকৃত এই খতিয়ানে যে ১০টি হত্যাকাণ্ডের কথা বুক ফুলিয়ে বলা হয়েছে, তার একটির সাথেও রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই!

তাহলে প্রশ্ন জাগে, এই ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কারা? এই খুনের মিছিলের পেছনে কার হাত রয়েছে? জেএসএস কি সততা সাহস নিয়ে তাদের নিজেদের প্রতিবেদনে স্বীকার করবে যে, এই হত্যাকাণ্ডগুলোর সিংহভাগই ঘটেছে তাদের নিজেদের এবং ইউপিডিএফ (প্রসীত) কিংবা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত, চাঁদাবাজির বখরা এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের কারণে? জেএসএস কি কখনো নিজেদের প্রতিবেদনে নিজেদের নাম খুনি হিসেবে তালিকাভুক্ত করবে? উত্তরটি অত্যন্ত সহজ- না, তারা তা কখনই করবে না। তারা নিজেদের অপরাধের পাহাড় আড়াল করতে সর্বদা অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর নিকৃষ্ট রাজনীতিতে অভ্যস্ত।

পাহাড়ে যখনই কোনো হত্যাকাণ্ড, অপহরণ কিংবা সহিংস অপরাধের ঘটনা ঘটে, তখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং সন্দেহভাজন আসামিদের গ্রেপ্তার করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখনই এই পেশাদার খুনি ও সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান পরিচালনা করে, তখনই জেএসএস ও তাদের সমমনা গ্রুপগুলো এক অদ্ভুত ও জঘন্য খেলায় মেতে ওঠে। তারা এই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করার সংখ্যাটিকে অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের আগামী দিনের 'মানবাধিকার প্রতিবেদন'-এ অন্তর্ভুক্ত করে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ও জাতিসংঘে প্রচার করে যে- 'নিরীহ জুম্মদের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তার চলছে।'

এটি রাষ্ট্রের জন্য এক নির্মম 'শাঁখের করাত'। অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করলে পাহাড়ে লাশের পাহাড় জমবে, আর গ্রেপ্তার করতে গেলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মিলবে 'মানবাধিকার লঙ্ঘন'-এর তকমা। এই কুৎসিত ও অপকৌশলের রাজনীতির মাধ্যমেই জেএসএস দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের বৈশ্বিক দরবারে 'শোষিত' হিসেবে জাহির করে আসছে, অথচ ঘরের ভেতরে তারা নিজেরাই সবচেয়ে বড় শোষক ও জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে পুরোপুরি অবৈধ অস্ত্রমুক্ত করতে এবং সাধারণ অবাঙালি-বাঙালি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি, জেএসএস (সন্তু), ইউপিডিএফ (প্রসীত) কিংবা কেএনএফ-এর মতো সবকটি সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক শাখার একটিই অভিন্ন ও প্রধান দাবি- ‘পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী সরাতে হবে, সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করতে হবে; অন্যথায় শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হবে না।’

শান্তিচুক্তির দোহাই দিয়ে সেনা প্রত্যাহারের এই জিকির তোলার পেছনের আসল উদ্দেশ্যটি কী, তা আজ আর সচেতন মহলের অজানা নয়। এটি আসলে পাহাড়কে সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে নিজেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার এক গভীর দেশবিরোধী চক্রান্ত। সেনাবাহিনী যদি পাহাড় থেকে চলে যায়, তবে এই সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চাঁদাবাজি, অস্ত্র চোরাচালান, অপহরণ এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে আর কোনো বাধা থাকবে না। তারা স্বাধীনভাবে পাহাড়ে নিজেদের একচ্ছত্র ও সশস্ত্র জিম্মিদশা কায়েম করতে পারবে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ধোঁয়া তুলে তারা মূলত নিজেদের অবৈধ অস্ত্রের রাজত্বকে বৈধতা দিতে চায়।

নিজেদের স্বার্থের সামান্যতম ক্ষতি হলেই যারা রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও প্রহসনের বুলি তোলে, মানবাধিকারের ধোঁয়া তুলে যারা কাল হয়তো আবার জাতিসংঘে গিয়ে দেশের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগের ঝুলি খুলবে, তাদের আসল চেহারা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সময় এসেছে। আন্তর্জাতিক লবিংয়ের মাধ্যমে তারা নিজেদের যে 'শান্তিকামী' মুখোশ পরে রেখেছে, তা আজ ছিন্নভিন্ন।

পরবর্তী ছয় মাসের প্রতিবেদনে জেএসএস আজকের এই পানছড়ির তিন কর্মীর খুনের ঘটনাকে কীভাবে দেখাবে, তা হয়তো দেখার বিষয়; তবে সাধারণ মানুষ আজ সম্পূর্ণ সচেতন। মানুষ জেনে গেছে, জেএসএস-এর রাজনীতি কেবলই একটি মুখোশ। এর অন্তরালে রয়েছে কেবল অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, সাধারণ মানুষের রক্ত চোষা চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার লোভ। এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকেও খুব শীঘ্রই তারা বয়কটের মুখোমুখি হতে বাধ্য।

রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের মূল্য সমান- তা সে অবাঙালি হোক কিংবা বাঙালি। অপরাধী অবাঙালি বা বাঙালি নয়, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী। পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে রাষ্ট্রকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কোনো তথাকথিত মানবাধিকার প্রতিবেদনের চাপ বা আন্তর্জাতিক লবিংয়ের মায়াকান্নায় কান না দিয়ে, পার্বত্য অঞ্চলকে সম্পূর্ণ অবৈধ অস্ত্রমুক্ত করতে সেনাবাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের দেশবিরোধী দাবিকে শক্ত হাতে দমন করে, পাহাড়ের প্রতিটি কোণায় আইনশৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করাই হোক এই মুহূর্তের প্রধান অঙ্গীকার। পাহাড়ের বুক থেকে চিরতরে নিপাত যাক এই লাশের ও অস্ত্রের কুৎসিত রাজনীতি।

লেখক: সাংবাদিক গোলাম যাকারিয়া