বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা চার দিনের ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ভয়াবহ দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশু রয়েছেন। টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরে দ্বিতীয় দিনের মতো জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে এবং পাহাড়ি এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে আরও দুই দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আষাঢ় মাসের প্রথম ২০ দিন প্রায় বৃষ্টিহীন থাকার পর স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় শুরু থেকেই প্রশাসনিক সমন্বয় থাকলে প্রাণহানি আরও কমানো সম্ভব হতো। তবে আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বলেন, বর্ষাকালে সাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হলে উপকূলীয় এলাকায় এ ধরনের ভারী বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক ঘটনা।
পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যু
টানা বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় তিন দিনে অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে প্রথম তিন দিনে ২২ জন এবং বান্দরবানের লামায় পৃথক দুটি পাহাড়ধসে আরও পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এর আগে, রোববার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আটজন, জেলা সদরে একজন এবং পেকুয়ায় একজনসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সর্বশেষ কক্সবাজারে পাঁচজন এবং চট্টগ্রামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
উখিয়ায় দেয়াল ধসে পাঁচ শিক্ষার্থীর মৃত্যু
কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মহিলা হেফজখানার (মাদ্রাসা) ওপর দেয়াল ধসে পাঁচ ছাত্রী নিহত হয়েছে। ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ের খাদে নির্মিত দেয়ালটি মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়লে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত চার ছাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করেছেন ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি সিরাজ আমিন। তাঁরা হলেন—৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), আবদুস শুকুরের দুই মেয়ে উন্মে নেজাতুল (১৩) ও উন্মে সালমা (১২), এবং মো. ইলিয়াছের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩)।
গতকাল বেলা দুইটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসাটিতে ৩০ জন শিশু ছিল। ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প প্রশাসন, এপিবিএন সদস্য ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। সন্ধ্যায় উদ্ধারকাজ শেষ হয়।
এ ঘটনায় তিন শিশু-কিশোরী গুরুতর আহত হয়েছে। তাদের কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা হলো—৩ নম্বর ক্যাম্পের দিল মোহাম্মদের মেয়ে আসরা বেগম (৯), একই ক্যাম্পের এফ-১ ব্লকের নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান (১৫) এবং ৫ নম্বর ক্যাম্পের এ-৭ ব্লকের বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২)। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৩০ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছে এবং গুরুতর আহত তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল নয়টার দিকে নগরের জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ির ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম মারা যায়। এ ঘটনায় শিশুটির মা লামিয়া আক্তার মাটিচাপা পড়ে আহত হন।
একই দিন দুপুরে নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় পাহাড়ধসে সামিয়া ইসলাম (১৩) নামের আরেক শিশুর মৃত্যু হয়।
বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া এলাকায় পৃথিল দুটি পাহাড়ধসে দুই পরিবারের পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি পরিবারের স্বামী-স্ত্রী ও তাঁদের পাঁচ বছরের সন্তান এবং অন্য পরিবারের স্বামী-স্ত্রী রয়েছেন।
জেলা পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, লামার একই এলাকায় পৃথক দুই পাহাড়ধসে শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। মরদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশ জানায়, প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার ভোর আনুমানিক চারটার দিকে আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায়। পাহাড়ধসে নিজ বসতঘরে ঘুমিয়ে থাকা একই পরিবারের তিন সদস্য মাটিচাপা পড়ে নিহত হন। তাঁরা হলেন মো. ইউনুস (৪০), তাঁর স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫) এবং তাঁদের ছেলে মো. সোলেমান (৫)।
স্থানীয় বাসিন্দারা শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সহায়তায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর, ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে একই ইউনিয়নের মিশনপাড়া এলাকায় আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে মাটি ও ঘরের দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে স্বামী-স্ত্রী মো. জুয়েল (৩৪) ও কুলছুমা আক্তার (২৫) নিহত হন। তাঁরা একতলা পাকা ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন।
পুলিশ জানায়, টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। পাশাপাশি নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়া, জনজীবন ও সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কিছু বাসিন্দা এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী জানিয়ে পুলিশ বলেছে, তাঁদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। লামা উপজেলার পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, পাঁচলাইশ, হালিশহর, রামপুরা, চান্দগাঁও, কাপাসগোলা, বাদুড়তলা, খাজা রোড, আকবরশাহসহ বিভিন্ন এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকে। নিচু এলাকার ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
ভারী বর্ষণে নগরের প্রায় চার কিলোমিটার রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেনে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী চলাচল করলেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
একটানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪৫০ পর্যটক সাজেকে আটকা পড়েছেন। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় প্রশাসন সেখানে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে। একই কারণে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় শুক্রবার পর্যন্ত পর্যটকদের প্রবেশও বন্ধ রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় অন্তত ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন, সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত এবং কৃষিজমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনও কাটেনি। পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার কার্যক্রম, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।


