বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানের ৯১তম জন্মদিন আজ। স্বল্প জীবনে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে অনন্য সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রাখার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাংস্কৃতিক ভূমিকার জন্যও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। তার পারিবারিক নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মণি সিংহের দেওয়া ‘রায়হান’ নামটি তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর থেকেই তিনি জহির রায়হান নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল তার। মাত্র ১৪ বছর বয়সে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার প্রথম কবিতা ‘ওদের জানিয়ে দাও’ প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে কথাসাহিত্যে নিজস্ব ধারা তৈরি করেন তিনি। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’।
ভাষা আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন জহির রায়হান। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে বের হওয়া মিছিলে তিনি অংশ নেন। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা তার উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান করে নেয়। উপন্যাসটির বিখ্যাত উচ্চারণ—‘আসছে ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হব’—পরবর্তী সময়ে অধিকার ও প্রতিবাদের প্রতীকী বক্তব্যে পরিণত হয়।
জহির রায়হানের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘বরফ গলা নদী’, ‘তৃষ্ণা’, ‘আরেক ফাল্গুন’ ও ‘কয়েকটি মৃত্যু’। এসব রচনায় গ্রামীণ জীবন, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মধ্যবিত্ত জীবনের নানা সংকট ও টানাপোড়েন উঠে এসেছে।
সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দেন জহির রায়হান। ১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে কাজের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘সঙ্গম’ ও ‘বাহানা’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
তার নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা, স্বৈরাচারবিরোধী চেতনা এবং বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় তুলে ধরে। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় চলচ্চিত্রকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে প্রামাণ্যচিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্বাধীনতার পর জহির রায়হান নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের সন্ধান এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার উদ্যোগে সক্রিয় হন। একই সময়ে তার বড় ভাই, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে আটকে রাখার খবর পেয়ে তাকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে সেখানে যান জহির রায়হান। মিরপুরে সশস্ত্র সংঘর্ষের মধ্যে তিনি নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে প্রচলিত বর্ণনা রয়েছে। তবে তার মরদেহ কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে তার অন্তর্ধান ও মৃত্যুর ঘটনা আজও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় অধ্যায় হয়ে আছে।
মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিখোঁজ হওয়া জহির রায়হান সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রে রেখে গেছেন অসামান্য উত্তরাধিকার। অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাংস্কৃতিক ভূমিকা এবং সাহসী সৃষ্টিশীলতা তাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে।


