বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য সীমান্তে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘খুমি পিপলস ফোর্স’ (কেপিএফ) নামের একটি সশস্ত্র সংগঠন। মিয়ানমারের চিন রাজ্যের পালেতওয়া অঞ্চলে চলমান সংঘাত, আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং খুমি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা সংকটকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির আবির্ভাব ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংগঠনটির সদস্যদের বান্দরবানের সীমান্তবর্তী এলাকায় দেখা যাওয়ার খবর এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে সহায়তা চাওয়ার ঘটনা নতুন করে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
যদিও কেপিএফ-সম্পর্কিত বহু তথ্য এখনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক সূত্রে পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
মিয়ানমারের যুদ্ধ ও নতুন বাস্তবতা
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার কার্যত বহুমুখী গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ বাহিনীগুলোর লড়াই দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ঘটে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, যখন রাখাইনভিত্তিক শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পালেতওয়া অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। পালেতওয়া শুধু চিন রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ নয়; এটি বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছাকাছি এবং ভারত-মিয়ানমার সংযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
আরাকান আর্মির এই অগ্রযাত্রার ফলে অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়। বিশেষ করে খুমি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করে।
কে এই কেপিএফ?
বিভিন্ন স্থানীয় ও আঞ্চলিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ‘কেপিএফ’ বা খুমি পিপলস ফোর্স হলো খুমি জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক একটি নতুন সশস্ত্র সংগঠন। এর রাজনৈতিক শাখা হিসেবে ‘খুমি ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি’ (কেএনসিপি) এবং সামরিক শাখা হিসেবে কেপিএফ কাজ করছে বলে জানা যায়।
সংগঠনটির দাবি, তারা খুমি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করছে। তবে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো, সদস্যসংখ্যা, অর্থায়ন এবং সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো সীমিত।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কেপিএফের উত্থান মূলত পালেতওয়া অঞ্চলে সৃষ্ট নতুন ক্ষমতার সমীকরণের প্রতিক্রিয়া।
আরাকান আর্মির সঙ্গে দ্বন্দ্ব
খুমি-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, পালেতওয়ায় আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় খুমি জনগোষ্ঠীর ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতিতে খুমিদের একটি অংশ নিজেদের আলাদা সামরিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়।
অন্যদিকে আরাকান আর্মি এ ধরনের অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও, সীমান্তবর্তী এলাকায় কাজ করা কয়েকজন পর্যবেক্ষকের মতে পালেতওয়া অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাস্তবেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ
চলতি বছরের জুন মাসে পালেতওয়ার কয়েকটি গ্রাম থেকে তরুণ-তরুণীদের জোরপূর্বক কেপিএফে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সংগঠনটির সদস্যরা গভীর রাতে কয়েকটি গ্রামে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪০ জন যুবক-যুবতীকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যায়।
এ অভিযোগের বিষয়ে কেপিএফের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে এ ধরনের খবর সীমান্তবর্তী খুমি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে খুমি পরিবার
মিয়ানমারের সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের সীমান্তেও।
স্থানীয় প্রশাসন ও সীমান্ত সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পালেতওয়া অঞ্চল থেকে খুমি পরিবারের বাংলাদেশমুখী প্রবেশের প্রবণতা বেড়েছে। গত ৪ জুন বান্দরবানের থানচি সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের সময় ৪৭ জন খুমি নাগরিককে আটক করে বিজিবি। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সীমান্তে নতুন করে আরও আশ্রয় সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বান্দরবানে কেপিএফের উপস্থিতির দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে বান্দরবানের রুমা ও থানচি সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ‘কেপিএফ’ সদস্যদের চলাচল লক্ষ্য করা গেছে।
সূত্রগুলো বলছে, প্রথমে ত্রিদেশীয় সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় তাদের উপস্থিতি দেখা গেলেও পরবর্তীতে আরও কয়েকটি সীমান্তবর্তী পাড়ায় তাদের যাতায়াতের খবর পাওয়া যায়।
তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কেপিএফের কোনো স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে—এমন তথ্য সরকারি কোনো সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
বিজিবির কাছে সহায়তা চাওয়ার খবর
নিরাপত্তা সূত্র ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কেপিএফ’ গত মে মাসে বিজিবির একটি সীমান্ত পোস্টে একটি চিঠি পাঠায়।
চিঠিতে সংগঠনটি নিজেদের নিরাপত্তা সংকটের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় চলাচল ও আলোচনার সুযোগ চেয়েছে বলে জানা যায়।
বিজিবি জানিয়েছে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কোনো বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না।
একজন ঊর্ধ্বতন বিজিবি কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সীমান্তে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অনুমতি দেওয়া হবে না। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
ভারতের কাছেও আবেদন
সূত্রগুলো বলছে, ‘কেপিএফ’ ভারতের মিজোরামেও একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি চেয়েছিল। তবে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাজনিত কারণে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।
এ ঘটনাকে বিশ্লেষকরা সংগঠনটির নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ত্রিদেশীয় সীমান্ত?
বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সংযোগস্থল পার্বত্য অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজরে রয়েছে।
ঘন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড়, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের জটিল ভূপ্রকৃতির কারণে এ অঞ্চল বহু দশক ধরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচলের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, এই এলাকায় শতভাগ নজরদারি বজায় রাখা বাস্তবিক অর্থেই কঠিন। কারণ এটি ঐতিহাসিকভাবে গেরিলা গোষ্ঠী, চোরাকারবারি ও বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের চলাচলের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান সশস্ত্র বাস্তবতা
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল নিজেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের কার্যক্রমের কারণে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
বর্তমানে জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), জেএসএস (সংস্কার), মগ লিবারেশন পার্টি এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) বিভিন্ন মাত্রায় সক্রিয় রয়েছে বলে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে নতুন কোনো বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করা সহজ হবে না। তবে তাদের উপস্থিতি স্থানীয় নিরাপত্তা সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা প্রশ্নে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মির উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের অনুপ্রবেশ এবং স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অভিযোগ উঠে এসেছে।
যদিও এসব ঘটনার সবগুলো সরকারি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি, তবুও সীমান্ত নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
বিশ্লেষকদের মতে, কেপিএফের আবির্ভাব নিজে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি মিয়ানমারের সংঘাতের নতুন একটি অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করছে।
যদি পালেতওয়া অঞ্চলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে সীমান্ত অতিক্রম করে মানবিক সংকট, অস্ত্র পাচার, অনুপ্রবেশ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সীমান্তে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা, কোনো বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়া এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য মানবিক সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকা।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে হলেও, তার অভিঘাত যে বাংলাদেশের পার্বত্য সীমান্তে অনুভূত হতে শুরু করেছে—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই বাস্তবতারই নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে।


