মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন সীমান্তজুড়ে আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান সামরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এবার সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলছে খুমি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ। সেই প্রতিরোধের অংশ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে ‘খুমি পিপলস ফোর্স’ (কেপিএফ) নামের নতুন একটি সশস্ত্র সংগঠন। পালেতওয়া অঞ্চলে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর খুমিদের ওপর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করেই সংগঠনটির উত্থান ঘটেছে বলে বিভিন্ন স্থানীয় ও আঞ্চলিক সূত্র দাবি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা সংকট আলোচিত হলেও মিয়ানমারের চলমান সংঘাতে অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর যে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে, কেপিএফের উত্থান সেই বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন।
আরাকান আর্মির উত্থান ও নতুন সংকট
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আরাকান আর্মি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পালেতওয়া অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এই বিজয়ের মাধ্যমে সংগঠনটি শুধু রাখাইন নয়, চিন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
তবে এই নতুন বাস্তবতায় পালেতওয়ার খুমি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেদের ক্রমবর্ধমানভাবে কোণঠাসা বোধ করতে শুরু করে। খুমি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ, আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে খুমিদের ভূমিকা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
আরাকান আর্মি এসব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে সীমান্ত অঞ্চলে কর্মরত পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পালেতওয়ায় নতুন ক্ষমতার ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে জাতিগত উত্তেজনা বাস্তবেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
খুমিদের প্রতিরোধের মুখ হিসেবে কেপিএফ
এই প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করে খুমি পিপলস ফোর্স (কেপিএফ)। সংগঠনটির রাজনৈতিক শাখা হিসেবে ‘খুমি ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি’ (কেএনসিপি) এবং সামরিক শাখা হিসেবে কেপিএফ কাজ করছে বলে জানা গেছে।
সংগঠনটির সমর্থকরা বলছেন, খুমি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, ভূমি অধিকার এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই কেপিএফ গঠিত হয়েছে। তাদের দাবি, আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণের মুখে খুমিদের সামনে আত্মরক্ষামূলক সংগঠন গড়ে তোলা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কেপিএফের জন্ম মূলত একটি প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া, যা পালেতওয়ার পরিবর্তিত সামরিক বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
শুধু রোহিঙ্গা নয়, অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর অভিযোগও বাড়ছে
মিয়ানমারের সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে প্রাধান্য পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
খুমি, মারমা, ম্রো এবং চিন জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ থেকে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, জোরপূর্বক নিয়োগ, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং স্থানীয় প্রশাসনে একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠে এসেছে।
যদিও এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও বিভিন্ন মানবাধিকার পর্যবেক্ষক এবং স্থানীয় সূত্র বলছে, আরাকান আর্মির দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ
চলতি বছরের জুন মাসে পালেতওয়ার কয়েকটি গ্রাম থেকে তরুণ-তরুণীদের জোরপূর্বক কেপিএফে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ ওঠে।
তবে খুমি সম্প্রদায়ের একাংশের দাবি, এই ধরনের অভিযোগের পেছনে স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বও থাকতে পারে। অন্যদিকে স্বাধীনভাবে ঘটনাগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং কেপিএফও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশ সীমান্তে
পালেতওয়ায় চলমান উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বান্দরবান সীমান্তে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খুমি পরিবারগুলোর বাংলাদেশমুখী প্রবেশের ঘটনা বেড়েছে বলে সীমান্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে।
গত ৪ জুন থানচি সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের সময় ৪৭ জন খুমি নাগরিককে আটক করে বিজিবি। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, সীমান্ত অতিক্রমকারীদের একটি অংশ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।
বান্দরবানে কেপিএফের উপস্থিতির দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, বান্দরবানের রুমা ও থানচি সীমান্তবর্তী এলাকায় কেপিএফ সদস্যদের চলাচল লক্ষ্য করা গেছে।
তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংগঠনটির কোনো স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে—এমন তথ্য এখনো সরকারি কোনো সংস্থা নিশ্চিত করেনি।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, দেশের ভূখণ্ড কোনো বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, কেপিএফের আবির্ভাব কেবল একটি নতুন সশস্ত্র সংগঠনের জন্ম নয়; এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিগত শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত।
একসময় আরাকান আর্মিকে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াইরত একটি শক্তি হিসেবে দেখা হলেও, বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উদ্বেগ বাড়ছে। খুমিদের প্রতিরোধ সংগঠন গঠনের উদ্যোগ সেই উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মিয়ানমারের সংঘাত এখন আর কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা, জনসংখ্যাগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়তে শুরু করেছে।
সীমান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পালেতওয়ায় আরাকান আর্মি ও খুমি প্রতিরোধ বাহিনীর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়, তাহলে নতুন শরণার্থী প্রবাহ, অস্ত্র পাচার এবং সীমান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং সীমান্তে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


