বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের ১১ বছর পূর্ণ হয়েছে গত শুক্রবার (৩১ জুলাই)। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে কার্যকর হওয়া ঐতিহাসিক এই বিনিময়ের মধ্য দিয়ে দুই দেশের ১৬২টি ছিটমহলের ৫১ হাজারের বেশি মানুষ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নাগরিকত্বের আওতায় আসেন। এক দশকের বেশি সময় পর বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে দৃশ্যমান উন্নয়ন এলেও ভূমি ও নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ১১ বছরে দাসিয়ারছড়াসহ বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অধিকাংশ সড়ক পাকা হয়েছে, বিদ্যুৎ পৌঁছেছে প্রায় সব বাড়িতে এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ১৬২টি ছিটমহল সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছিল ভারতের ১১১টি এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল। ২০১১ সালের যৌথ জনগণনা অনুযায়ী, এসব ছিটমহলে ৫১ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস ছিল।

ভিন্ন দেশের ভূখণ্ডে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করায় ছিটমহলবাসীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও আইনশৃঙ্খলা সেবাসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিলেন। পরিচয়পত্রের অভাবে অনেককে অন্যের ঠিকানা ব্যবহার করে পড়াশোনা কিংবা চিকিৎসাসেবা নিতে হতো। স্থানীয়ভাবে তাঁদের পরিচয় ছিল ‘ছিটের মানুষ’, যা সামাজিক বৈষম্যেরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ছিটমহল বিনিময়ের উদ্যোগ নতুন ছিল না। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নুন ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়।

বিনিময়ের সময় বাসিন্দাদের নিজ নিজ অবস্থানে থেকে নাগরিকত্ব গ্রহণ অথবা পছন্দের দেশে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অধিকাংশ মানুষ নিজ এলাকায় থেকে গেলেও কিছু পরিবার ভারত চলে যায়।

বিনিময়ের সময় দাসিয়ারছড়া ছেড়ে ভারতে যাওয়া বাসিন্দাদেন অভিযোগ, নতুন দেশে (ভারতে) নাগরিকত্ব পেলেও সবার পক্ষে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়নি। তাদের মতে, অনেক মুসলিম পরিবারের পক্ষে নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানো কঠিন এবং সুযোগ পেলে অনেকে বাংলাদেশে ফিরতে চান। তবে ভারত সরকার তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেনি বলেও তারা উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, ছিটমহলবাসীরা এখন স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন, যা তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। তবে ভূমি ও নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত কিছু জটিলতা এখনো রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার সেসব সমস্যারও সমাধান করবে।

স্থানীয়দের মতে, ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ৬৮ বছরের রাষ্ট্রীয় অনিশ্চয়তার অবসান হলেও কয়েক দশকের বঞ্চনা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে আরও সময় ও বিশেষ সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।