নাফ নদী রোহিঙ্গাদের কাছে শুধু একটি নদীর নাম নয়। এটি তাদের কান্না, হারানো স্বজন, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং নিরাপত্তার আশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ইতিহাস।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকায় এই নদীর তীর প্রত্যক্ষ করেছিল এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। সেদিন হাজারো রোহিঙ্গা নারী, শিশু, পুরুষ ও বৃদ্ধ জীবনের নিরাপত্তার আশায় নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিল না কোনো অস্ত্র, ছিল না কোনো যুদ্ধের ইচ্ছা—ছিল শুধু বেঁচে থাকার আকুতি।

কেউ কোলে নিয়েছিলেন ছোট সন্তানকে, কেউ কাঁধে বহন করছিলেন সামান্য কিছু জিনিসপত্র, কেউ আবার ধরে রেখেছিলেন পরিবারের শেষ সদস্যের হাত। তারা ভেবেছিলেন, নদীর ওপারে পৌঁছাতে পারলেই হয়তো জীবন রক্ষা পাবে।

কিন্তু সেই যাত্রা শেষ হয়েছিল রক্ত আর কান্নায়।

নিরাপত্তার শেষ আশাটিও পরিণত হয়েছিল মৃত্যুফাঁদে

রাখাইনের মংডু এলাকায় সংঘর্ষ তীব্র হওয়ার পর বহু রোহিঙ্গা পরিবার নিজেদের গ্রাম ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। চারদিকে গোলাগুলি, হামলা ও আতঙ্কের মধ্যে তারা নাফ নদীর তীরে জড়ো হন।

বিকেল প্রায় ৫টার দিকে নদীর তীরে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। প্রত্যেকের চোখে ছিল একই প্রশ্ন—তারা কি নিরাপদে পৌঁছাতে পারবেন?

কিন্তু কিছুক্ষণ পর আকাশে দেখা যায় ড্রোন। এরপর শুরু হয় বিস্ফোরণ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ড্রোন হামলা, মর্টার ও গোলাবর্ষণে মুহূর্তেই নদীর তীর পরিণত হয় আতঙ্কের স্থানে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর্তনাদ। অনেক পরিবার মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে ফেলে তাদের প্রিয়জনদের।

একজন বাবার শেষ বিদায়

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ফয়াজ (ছদ্মনাম) সেই দিনের একজন বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গা।

তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছিলেন। তার স্ত্রী কোলে বহন করছিলেন তাদের ছয় বছরের মেয়েকে। বড় সন্তানটি পাশে হাঁটছিল। সামনে ছিলেন তার স্ত্রীর বোন, যার কোলে ছিল মাত্র আট মাসের শিশু।

হঠাৎ বিস্ফোরণ।

প্রথম হামলাতেই নিহত হন শিশুটির মা। ছোট শিশুটি গুরুতর আহত হয়।

ফয়াজ ছুটে গিয়ে শিশুটিকে কোলে তুলে নেন। কিন্তু চারপাশে তখনও হামলা চলছিল।

কিছুক্ষণ পর তার কোলেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় শিশুটির জীবন।

বাংলাদেশে যাওয়ার নৌকায় ওঠার সময় মাঝি মৃত শিশুটিকে সঙ্গে নিতে অস্বীকৃতি জানান। বাধ্য হয়ে নদীর তীরেই নিজের সন্তানের জন্য কবর তৈরি করেন এক অসহায় বাবা।

একজন পিতা হিসেবে তার সেই মুহূর্তের কষ্ট কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

একদিনে পুরো পরিবার হারানো নিসার

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, নিসার (ছদ্মনাম) সেদিন মা, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও বোনকে নিয়ে নদীর তীরে এসেছিলেন।

তিনি জানান, হঠাৎ ড্রোনের শব্দ শোনা যায়। এরপর বিকট বিস্ফোরণে সবাই মাটিতে পড়ে যান।

আক্রমণ থামার পর তিনি বুঝতে পারেন—তার চারপাশের পৃথিবী বদলে গেছে।

তার পরিবারের কেউ আর বেঁচে নেই।

নিসারের হাতে ছিল শুধু স্মৃতি আর কিছু ভিডিও, যেখানে তিনি হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের শেষ মুহূর্ত দেখতে পান।

তিনি বলেন, “আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। আমি সবকিছু হারিয়েছি। কেন আমি বেঁচে আছি, তা জানি না।”

কারা চালিয়েছিল হামলা?

বেঁচে যাওয়া বহু রোহিঙ্গা অভিযোগ করেছেন, হামলাগুলো আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, প্রথমে গ্রামগুলোতে হামলার কারণে তারা পালাতে বাধ্য হন, পরে নদীর তীরেও হামলার শিকার হন।

ওইদিন নাফ নদীর তীরে ও সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মির ড্রোন ও ভারী অস্ত্রের হামলায় বহু রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টাকালে নাফ নদীর পাড়ে ও নদে এই মর্মান্তিক হতাহতের ঘটনা ঘটে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থায় 'নাফ নদী গণহত্যা' হিসেবে আলোচিত হয়।

তবে, আরাকান আর্মি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ঘটনাটি তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ঘটেনি এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

তবে মানবাধিকার সংগঠন ফোর্টিফাই রাইটস এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঘটনাটির নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম

রোহিঙ্গাদের বর্তমান সংকট কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এটি বহু দশকের বৈষম্য, অধিকারহীনতা, সহিংসতা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিক পরিণতি। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর বিশ্ববাসীর সামনে রোহিঙ্গা সংকট নতুন করে আলোচনায় আসে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বঞ্চনা ও নিপীড়নের ইতিহাস তারও বহু আগের।

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গারা এখনও একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। কেউ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে অপেক্ষা করছেন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য, কেউ রাখাইনে সংঘাতের মধ্যে আটকে আছেন, আবার কেউ নতুন করে বাস্তুচ্যুতির শিকার হচ্ছেন।

রাখাইনে দীর্ঘদিনের সংকট

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি জাতিগোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে এই অঞ্চলের ইতিহাস বহু পুরোনো। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে তারা নাগরিক অধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন।

নাগরিকত্ব সংকট তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা কার্যত রাষ্ট্রহীন অবস্থায় পড়ে যান।

এই অধিকারহীনতা ধীরে ধীরে বৈষম্য, নিপীড়ন এবং নিরাপত্তাহীনতায় রূপ নেয়।

২০১৭: যে বছর বিশ্ব দেখেছিল রোহিঙ্গাদের দুর্দশা

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওই অভিযানে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।

হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিহত হন বলে অভিযোগ ওঠে। বহু গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং লাখ লাখ মানুষ বাধ্য হন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে।

মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আশ্রয় শিবির।

তাদের অনেকেই এসেছিলেন শুধু শরীরে পরা কাপড় নিয়ে। পেছনে রেখে এসেছিলেন বাড়ি, জমি, স্বজন এবং স্মৃতি।

২০২৩: আরাকান আর্মি-মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সংঘাতে ফের বিপদে পড়ে রোহিঙ্গারা

২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে নতুন মোড় আসে। আরাকান আর্মি রাখাইন অঞ্চলে শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে।

২০২৪ সালে রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রার ফলে নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি পায়।

এই সংঘাতের মাঝে আবারও সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়ে রোহিঙ্গারা। কারণ তারা একই সঙ্গে জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের বাস্তবতার মধ্যে আটকা পড়ে।

৫ আগস্ট ২০২৪: নাফ নদীর ট্র্যাজেডি

রাখাইনের সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য ৫ আগস্ট ছিল নিরাপত্তার শেষ চেষ্টা।

কিন্তু মংডুর নাফ নদীর তীরে যা ঘটেছিল, তা রোহিঙ্গাদের ইতিহাসে আরেকটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকে।

বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, নদী পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা হয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ বহু মানুষ প্রাণ হারান।

এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।

২০২৫–২০২৬: সংকট আরও গভীর

২০২৬ সালে এসে রোহিঙ্গা সংকট এখনও সমাধান হয়নি।

রাখাইনে সংঘাত অব্যাহত থাকায় অনেক রোহিঙ্গা নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা, মানবিক সহায়তার প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সংকট ক্যাম্পগুলোর বাস্তবতাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

একটি প্রজন্ম এখন আশ্রয় ক্যাম্পে বড় হচ্ছে—যাদের জন্ম হয়েছে সংঘাতের মধ্যে, কিন্তু যারা শান্তি ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন দেখে।

বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকা

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মানবিক উদ্যোগ হলেও এটি একই সঙ্গে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা একটি কঠিন কাজ।

স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। পরিবেশ, কর্মসংস্থান, বাজার ব্যবস্থা এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

তবুও বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে।

ফিরে যাওয়ার অধিকার ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ

রোহিঙ্গাদের অধিকাংশের দাবি—তারা তাদের নিজ ভূমি রাখাইনে ফিরতে চান। তবে সেই প্রত্যাবর্তন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তার ভিত্তিতে।

শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। প্রয়োজন তাদের নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা।

২০১৭ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ সময়ে রোহিঙ্গারা হারিয়েছেন ঘর, স্বজন, নিরাপত্তা এবং শৈশবের স্মৃতি। কিন্তু তারা হারাননি বেঁচে থাকার ইচ্ছা।

স্মৃতির সঙ্গে লড়াই, ভবিষ্যতের আশায়

৫ আগস্ট এখন অনেক রোহিঙ্গার কাছে শুধু একটি তারিখ নয়—এটি হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মরণ করার দিন।

নাফ নদীর তীরে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা শুধু একটি পরিসংখ্যান নন। তারা ছিলেন কারো বাবা, কারো মা, কারো সন্তান, কারো স্বপ্ন।

তারা চান, নিহতদের গল্প হারিয়ে না যাক। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানুক কী ঘটেছিল। অপরাধের তদন্ত হোক এবং যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।

নাফ নদী আজও বয়ে চলছে। কিন্তু তার ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে আছে হাজারো রোহিঙ্গার কান্না, হারানোর স্মৃতি এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষা।

তারা ভুলে যায়নি। তারা স্মরণ করছে। তারা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছে।