রাঙামাটির সাজেকে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে কৃত্রিম উত্তেজনা সৃষ্টি ও নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনার দায় স্বীকার করে নিহতের পরিবার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে ক্ষতিপূরণ ও নানামুখী সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে- এই সহযোগিতার খবর প্রকাশ করায় মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকে ‘মিথ্যাচারী’ আখ্যা দিয়ে পত্রিকা পোড়ানোর মতো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে সংগঠনটি।

গত ১৮ জুলাই  সাজেকে বিজিবির একটি ট্রাকের ধাক্কায় অন্তঃসত্ত্বা স্কুলশিক্ষিকা সুমন্তি চাকমা নিহত হন। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার পর পরই বিজিবি জোন কার্যালয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা, শিক্ষিকা সুমন্তি চাকমার নিকটাত্মীয় ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এক সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত বৈঠকে বিজিবি কর্তৃক তাৎক্ষণিকভাবে ১ লাখ টাকা এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠাকিতার জন্য আরও ৪ লাখ টাকা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি নিহত শিক্ষিকার ৮ বছর বয়সী শিশুকন্যার পড়াশোনার পুরো দায়িত্ব, নিহতের ভাইয়ের চাকরির ব্যবস্থা এবং উক্ত সড়কে গতিরোধক নির্মাণের পূর্ণ অঙ্গীকার করে বিজিবি প্রশাসন। সাজেক ইউপি চেয়ারম্যান নিজে এই সহায়তার খবর গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র প্রথম আলো, ইত্তেফাক, যুগান্তর, একাত্তর টিভি, দৈনিক আজাদী, পার্বত্য নিউজ-সহ সকল মূলধারার গণমাধ্যম বিজিবির এই দায় স্বীকার, মানবিক পদক্ষেপ ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঘটনাটি বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদে তুলে ধরে।

কিন্তু বিজিবির এই দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের সমঝোতার খবর প্রকাশিত হতেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে ইউপিডিএফ। পাহাড়ে বিজিবি ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কৌশল হিসেবে তারা বিজিবির ‘দায়মুক্তি দেওয়ার মিথ্যা সংবাদ’ প্রচারের অভিযোগ তোলে। সোমবার (২০ জুলাই) সাজেকের উজোবাজারে ইউপিডিএফ সমর্থিত কথিত ‘গণ অধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর নামে নিজস্ব বলয়ের মানুষদের জড়ো করে প্রথম আলো পত্রিকা পায়ে মাড়িয়ে ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে উসকানিমূলক মহড়া দেওয়া হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিবাদে বক্তব্য রাখা বাবুবহন চাকমা ও নতুন জয় চাকমাসহ অন্যান্য বক্তারা মূলত ইউপিডিএফ-এর সমর্থক। প্রথম আলোসহ দেশের শীর্ষ সারির সব গণমাধ্যমকে ধিক্কার জানিয়ে তারা আসলে সাধারণ পাহাড়িদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।

গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মঈনুল হাসান বলেন, ঘটনাটি অবশ্যই দুঃখজনক ও মর্মান্তিক। তবে যদি বিজিবি ঘটনা অস্বীকার করত বা পরিবারটিকে কোনো ক্ষতিপূরণ না দিত, তবে প্রতিবাদ যৌক্তিক হতে পারত। কিন্তু বিজিবি যেখানে সম্পূর্ণ ঘটনা স্বীকার করে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করেছে, সেখানে সেই সত্য খবর প্রকাশ করায় গণমাধ্যমের ওপর ক্ষুব্ধ হওয়া প্রমাণ করে যে- এখানে একটি বিশেষ পক্ষের উসকানি আছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো পাহাড়ে বিজিবি-বিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়া।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিতর্কিত করার রাজনৈতিক চক্রান্ত যখন সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই তারা পত্রিকা পোড়ানোর মতো চরমপন্থী পথ বেছে নিয়েছে।