মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক জনগণের ওপর সামরিক বাহিনী ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের গঠিত তদন্ত সংস্থা। এসব হামলার মধ্যে রয়েছে বাড়িঘর, স্কুল ও বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরে বিমান হামলা, নির্বিচারে আটক, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতা।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা (আইআইএমএম)। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের ঘটনাগুলো নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
আইআইএমএমের প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মধ্যে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো বিমান হামলার ঘটনাগুলো তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব হামলার ক্ষেত্রে কারা নির্দেশ দিয়েছে এবং সামরিক বাহিনীর কমান্ড কাঠামো কীভাবে কাজ করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে স্কুল ও হাসপাতাল লক্ষ্য করে চালানো বিমান হামলার ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। এসব হামলায় প্রায়ই শিশুরা হতাহত হচ্ছে। কোথায় হামলা হয়েছে এবং কী ধরনের গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে, তার প্রমাণ সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা।
বাড়ি-স্কুল-হাসপাতালে হামলা
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে বেসামরিক সরকার উৎখাত করার পর থেকেই মিয়ানমারে সংঘাত চলছে। ওই সময় উইন মিন্ট ও অং সান সু চিসহ দেশটির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হলে তা পরে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়। বর্তমানে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
আইআইএমএমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে সামরিক বাহিনীর হামলা আরও তীব্র হয় এবং নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও তা অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তকারীরা বাড়িঘর, স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র, ধর্মীয় স্থাপনা ও বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরে হামলার তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এসব হামলায় জড়িত কয়েকটি সামরিক ইউনিটকেও শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী মোটরচালিত প্যারাগ্লাইডার ও ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এতে বেসামরিক মানুষ হামলার আগাম আভাস কম পাচ্ছেন। ফলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া বা আশ্রয় নেওয়ার সময়ও কমে যাচ্ছে।
আটককেন্দ্রে নির্যাতন ও যৌন সহিংসতা
সামরিক বাহিনী পরিচালিত আটককেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনাও নথিভুক্ত করেছেন তদন্তকারীরা।
২০২৫ সালের একটি আইনের আওতায় নির্বাচন নিয়ে সমালোচনার অভিযোগে আটকের ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। ওই আইনে অনলাইনে সমালোচনামূলক মন্তব্য করার মতো কর্মকাণ্ডের জন্যও সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইআইএমএমের প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, এসব অপরাধের প্রতিটি প্রমাণের পেছনে এমন মানুষ রয়েছেন, যাদের জীবন ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। মিয়ানমারের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত সহিংসতার আশঙ্কায় বসবাস করছে এবং এসব ঘটনার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবও বয়ে বেড়াচ্ছে।
তবে আইআইএমএম জানিয়েছে, তাদের অধিকাংশ প্রমাণ সামরিক বাহিনী ও তাদের মিত্র মিলিশিয়াদের কর্মকাণ্ড নিয়ে হলেও সামরিক বাহিনীবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনাও তদন্ত করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে ১ হাজার ৬০০টির বেশি তথ্যসূত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৭৫০টির বেশি প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ছবি, ভিডিও, ফরেনসিক প্রমাণ ও স্যাটেলাইট চিত্র।
২০১৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল আইআইএমএম গঠন করে। ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারে সংঘটিত গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করাই সংস্থাটির মূল দায়িত্ব। ভবিষ্যতে এসব অপরাধের বিচারকাজে ব্যবহারের জন্য তারা বিভিন্ন আদালত ও কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণ সরবরাহ করে। তবে সংস্থাটি নিজে কোনো মামলার বিচার পরিচালনা করে না।
আইআইএমএমের সংগৃহীত প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), আর্জেন্টিনার আদালতে চলমান রোহিঙ্গা নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলা এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-এর কার্যক্রমে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
২০১৬–১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ওই সময় জাতিসংঘের তৎকালীন মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জায়েদ রা‘দ আল হুসেইন মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা নিপীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন।


