মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে হামের উপসর্গে দুই সন্তানকে হারিয়েছেন বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম লেটংপাড়ার বাসিন্দা নাংয়ো খুমি (৩৫)। বড় ছেলে খ্রেতং খুমি (৬) গত শুক্রবার সকালে মারা যায়। এর দুই দিন পর সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয় ছোট ছেলে প্রেলং খুমির (৪)।
পরপর দুই সন্তানকে হারিয়ে নাংয়ো খুমি এখন দিশাহারা। তাঁর বাড়ি রুমা সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লেটংপাড়ায়। দুর্গম এই পাড়া থেকে যানবাহন চলাচলের সড়কে পৌঁছাতে প্রায় ৯ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে খ্রেতং খুমির জ্বর, শ্বাসকষ্টসহ হামের উপসর্গ দেখা দেয়। দুর্গম এলাকার অন্যান্য পরিবারের মতো তাঁরাও প্রথমে বাড়িতেই চিকিৎসার চেষ্টা করেন। পরে শুক্রবার সকালে শিশুটির মৃত্যু হয়।
এরপর ছোট ছেলে প্রেলং খুমিও একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত হয়। বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পরদিন শনিবার তাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা রোববার রাতেই তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে অর্থসংকট ও সঙ্গে যাওয়ার লোক না পাওয়ায় তখন তাকে চট্টগ্রামে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে সোমবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর বিকেল পাঁচটার দিকে তার মৃত্যু হয়।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, প্রেলং খুমির হামের উপসর্গের পাশাপাশি তীব্র শ্বাসকষ্ট ছিল। তার জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ প্রয়োজন হওয়ায় আগের রাতেই চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিবার তখন তাকে নিতে পারেনি।
খুমি জনগোষ্ঠীর নেতা লেলুং খুমি বলেন, প্রেলং খুমির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার তার মরদেহ রুমায় নেওয়া হবে।
রুমা-থানচিতে হামের প্রাদুর্ভাব
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, বান্দরবানের রুমা ও থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের দাবি, চলতি মাসে হামের উপসর্গে অন্তত আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ এখন পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান সদর হাসপাতালে বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪২ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
সোমবার সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পুরুষ ওয়ার্ডের একটি অংশকে হামের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। শয্যার সংকট থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুই রুমা ও থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকা থেকে এসেছে।
স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গম এলাকার অনেক মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহী। হাসপাতালের নিয়মকানুন সম্পর্কে ধারণার অভাব, আর্থিক সংকট এবং পরিচিত সহায়তাকারী না থাকায় অনেক পরিবার সময়মতো শিশুদের চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসতে পারে না।
লেটংপাড়ার কার্বারি (পাড়াপ্রধান) শৈলুং খুমি বলেন, ২৬ পরিবারের ওই পাড়ায় শুধু শুক্র ও শনিবার হামের উপসর্গে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তাঁর আট বছরের মেয়েও রয়েছে। এর আগে একই পাড়ায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছিল।
রুমা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অংসিংনু মারমা ও গালেঙ্গ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেনরত ম্রো দাবি করেন, চলতি মাসে তাঁদের দুই ইউনিয়নে হামের উপসর্গে আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুর্গম পাড়াগুলোতে আরও অনেক শিশু আক্রান্ত রয়েছে।
বিশেষ টিকাদান অভিযান শুরু
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. হাসান জানান, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সোমবার উপজেলা পরিষদে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে বিশেষ টিকাদান অভিযান সমন্বিতভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মৌখিক ময়নাতদন্ত (ভার্বাল অটোপসি) করে এ পর্যন্ত হাসপাতালের বাইরে তিন শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
বান্দরবানের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ শাহিন হোসাইন চৌধুরী বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় সোমবার থেকে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ টিকাদান অভিযান শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থাগুলো যৌথভাবে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি জানান, টিকার বাইরে থাকা শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শনাক্ত করে টিকা দেওয়া হবে। রুমা ও থানচির কোনো শিশুই যাতে টিকার বাইরে না থাকে, সেটিই স্বাস্থ্য বিভাগের লক্ষ্য।


