বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে শত বছরের পুরোনো কমিউনিটি বন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে কাঠের ব্যবসার লোভে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী হেডম্যান, কার্বারি ও কিছু কমিউনিটি নেতার যোগসাজশে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে গাছ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায়—শুকিয়ে গেছে একমাত্র পানির উৎস, তীব্র হয়েছে পানির সংকট।
গত তিন বছরে একটি ৫০ একরের কমিউনিটি বন থেকে শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলার কারণে শুকিয়ে গেছে সেই ঝিরি, যেখান থেকে ৩৪টি ম্রো পরিবার পানীয় জল সংগ্রহ করত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা।
ম্রো জনগোষ্ঠীর কাছে ‘পারাবন’ নামে পরিচিত এই বনটি বান্দরবানের আলীকদম অঞ্চলে ক্রাউডং পাহাড়ের প্রায় ২,৫০০ ফুট উঁচু চূড়ার নিচে অবস্থিত। এই বন থেকে তারা ঘর তৈরির জন্য কাঠ ও বাঁশ, সারা বছরের খাদ্য উপকরণ এবং বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বায়েং জিরি ঝিরি থেকে পানীয় জল পেতেন। এই ঝিরিই ছিল তিনটি বসতির—পামিয়া পাড়া, তুংগুই পাড়া ও নামসাক পাড়ার—একমাত্র পানির উৎস।
সেখানকার বাসিন্দাদের তথ্যমতে, গাছ আর বাঁশ শেষ হয়ে যাওয়ার পর পানিও চলে গেছে। এখন তাদের খেতে হচ্ছে নোংরা পানি।
জানা গেছে, বনের বিভিন্ন স্থানে কাটা গাছের গুঁড়ি, পড়ে থাকা কাঠের টুকরো এবং শুকিয়ে যাওয়া ঝিরির অংশ।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় তিন বছর আগে গাছ কাটা শুরু হয় এবং বারবার অভিযোগ করার পরও তা বন্ধ হয়নি। প্রথম প্রতিবাদকারীদের একজন লায়রং ম্রো বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সেনা জোন কমান্ডারের কাছে জানালেও গাছ কাটা থামেনি।
তিনি বলেন, ‘তারা মেশিন এনে গাছ কাটে। একসঙ্গে দুই-তিনটি ট্রাক ঢোকে। রাস্তা তৈরির জন্য খননযন্ত্রও আনা হয়েছিল। ২০২৪ সালে আমরা প্রতিবাদ করেছি।’
গ্রামের এক কারবারি (গ্রামপ্রধান) পামিয়া ম্রো জানান, পারাবন বনে গর্জন, ভেল্লাক, চম্পা ফুরা ও ওমরি প্রজাতির বড় বড় গাছ ছিল। তিনি বলেন, ‘গত তিন বছর ধরে তারা সব বড় গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে।’ এসব কাঠ পরে পানবাজারে নেওয়া হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম জানান, চলতি বছরের শুরুতে একটি অবৈধ করাতকলে অভিযান চালিয়ে তিনি একটি সংগঠিত কাঠ পাচার চক্রের চিত্র দেখতে পান।
তিনি বলেন, ‘সেখানে অস্থায়ী শ্রমিক থাকার জায়গা ছিল। শ্রমিকরা বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে গাছ কাটত। শুধু তাদের ট্রাকই ওই রাস্তা ব্যবহার করত। সেখানে বিশাল বড় গাছ ছিল, কিন্তু কোনো রেকর্ড ছিল না।’
তিনি বলেন, অভিযানে প্রথম দিনেই ৪,৫০০ ঘনফুট কাঠ জব্দ করা হয়। তাদের নেটওয়ার্ক খুব শক্তিশালী। প্রতিটি জায়গায় তাদের নজরদারির লোক রয়েছে।”
ম্রোসহ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কমিউনিটি বনগুলো সাধারণত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে স্থানীয় রীতিনীতি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। বান্দরবান জেলায় এমন ২১৫টি কমিউনিটি বন রয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন পার্বত্য জেলায় এসব বনে ৫৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৬৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী এবং ১৬৩ ধরনের গাছ রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউএনডিপির একটি পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্পে কাজ করা রামবাদু ত্রিপুরা বলেন, বায়েং জিরির ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। পাশের উইঙ্কলিংপাড়া এলাকার বড় গাছও কেটে ফেলা হয়েছে, ফলে সেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ বনভূমি টিকে আছে।
তিনি বলেন, এই কাঠের ব্যবসা সংগঠিত এবং এর পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমর্থন রয়েছে। তার ভাষ্যমতে স্থানীয় হেডম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং কমিউনিটি নেতাদের অনেকেরই এসব গাছের সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত।
তিনি আরও বলেন, দার্জিলিংপাড়ায় কমিউনিটি বন চিহ্নিত করতে সীমানা খুঁটি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যাতে স্থানীয়রা বন রক্ষায় আইনি ভিত্তি পান। কিন্তু সেই খুঁটি স্থাপন করা হয়নি এবং শতবর্ষী গাছগুলো এখনো অরক্ষিত।
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুপ্রিয় চাকমা বলেন, ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই এই ধ্বংসের মূল কারণ। কাঠ ভারী জিনিস। এটি সড়ক দিয়েই যায়। হেলিকপ্টারে উড়ে যায় না। কেউ কাঁধে করে এত কাঠ নিয়ে যায় না।’
২০২৩ সালে জাতীয় সংসদ বন সংরক্ষণ আইন পাস করে, যার মাধ্যমে বন কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়ানো হয়। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে তারা কার্যকরভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারছেন না।
বান্দরবানের জেলা বন কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম বলেন, তার কার্যালয়ে অনুমোদিত জনবলের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ কর্মরত রয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ পদ খালি।
তিনি জানান, থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়ির মতো দুর্গম এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শনে যেতে যানবাহন ও জ্বালানি প্রয়োজন, কিন্তু বিভাগের সেই সক্ষমতা নেই।
দেশব্যাপী পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বন বিভাগ জানিয়েছে, সারা দেশে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫৩ একর বনভূমি অবৈধ দখলে রয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার একর সংরক্ষিত বন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বন হারানোর হার বছরে ২ দশমিক ৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বনভূমি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে, যেখানে বিশ্বব্যাপী কমেছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
বান্দরবানের সংসদ সদস্য জেরি সাচিং প্রু সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ ম্রো গ্রামে পানির সংকট বাড়ছে। পানির স্তর কমে যাচ্ছে। এর কারণ বন ধ্বংস এবং ঝিরি থেকে পাথর উত্তোলন।’
তিনি জানান, সরকার পর্যায়ক্রমে বন ও পানির সমস্যা সমাধানে মানচিত্র তৈরি ও পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপি সরকার পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দেশের কমে যাওয়া সবুজ আচ্ছাদন ফিরিয়ে আনতে এই উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে পামিয়া পাড়ার বাসিন্দাদের দাবি, তারা শুধু তাদের হারানো বন ফিরে পেতে চান।


