রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ: সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা’ শীর্ষক এক সেমিনারে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে দায়িত্বশীল, সুসংহত ও সার্বিক রাষ্ট্রীয় কৌশল গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা। একই সঙ্গে পার্বত্য সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে ১০ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়।
শনিবার (১৯ জুলাই) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এই সেমিনারের আয়োজন করে ‘সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন’। সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক ফজল। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশ এবং সঞ্চালনায় ছিলেন কবি ও গবেষক ড. ফজলুল হক তুহিন।
অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে বক্তব্য দেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন মণ্ডল, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম নজরুল ইসলাম, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুরশিদা ফেরদৌস এবং সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক সরদার আবদুর রহমান।
সেমিনারে প্রস্তাবিত ১০ দফা সুপারিশ:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত উপজাতীয় ও পশ্চাদপদ ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসহ দেশের সকল জনগণের সব ধরনের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তিতে সংবিধানের আলোকে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিস্পত্তি করতে হবে।
২. বাংলাদেশের কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা-বিরোধী যে কোনো ধরনের কর্মকান্ড ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী অপতৎপরতা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।
৩. দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা এবং জাতীয় অখন্ডতা হুমকির সম্মুখীন হতে পারে, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে- এমন বিষয়ের প্রতি কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।
৪. বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মাথাচড়া দিয়ে উঠতে পারে, প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হতে পারে, সর্বোপরি বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে দেশ বঞ্চিত হতে পারে- এমন সকল প্রকার তৎপরতা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. পার্বত্য এলাকায় ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সংঘটিত একটার পর একটা ঘটনার মিমাংসার একটি যুক্তিসংগত ও উভয়পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা উদ্ভাবনের মাধ্যমে দীর্ঘকালীন ব্যর্থতা দূর করতে আন্তরিকতার সাথে সৌহার্দের উন্মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পার্বত্য এলাকায় সংঘটিত নানা উস্কানি বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস সৃষ্টিকারী অপতৎপরতা রোধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে সরকার, বাঙালি ও উপজাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা প্রতিষ্ঠায় ঐক্যমতে উপনীত হওয়ার সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬. দেশ গঠনে দেশপ্রেমিক সৎ, যোগ্য এবং জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক সরকার এবং ও যোগ্যতা সম্পন্ন জনগোষ্ঠি গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে পার্বত্য এলাকায় শিক্ষা সুশিক্ষিত। শিক্ষা বিস্তারে গণশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৭. এই এলাকার ভূগর্ভস্থ ও উপরিস্থ সকল সম্পদের সুসম উন্নয়ন ও বন্টনের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে- যা প্রকারান্তে সমগ্র দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
৮. পার্বত্য অঞ্চলের দূর্গম এলাকায় যাতায়াতের লক্ষ্যে নতুন নতুন রাস্তা-ঘাট নির্মাণ এবং কাপ্তাই লেক এলাকায় নৌ-পথ উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৯. পার্বত্য অঞ্চলের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এবং স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় আর্থিক সুবিধা প্রদান করতে হবে।
১০. পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের কারণেই অনেক দেশই আজ এ অঞ্চলটি গ্রাসের পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অঞ্চলটির একদিকে যেমন রয়েছে বিশালাকৃতির পাহাড়ী অবস্থান অন্য দিকে (পশ্চিমে) রয়েছে বর্তমান বিশ্বের শক্তির কেন্দ্রবিন্দু বিশাল জলরাশি। এমতাবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানকে সুসংহত করতে নৌ-শক্তি বৃদ্ধিসহ সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, এটি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই এখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা ও অপপ্রচারের বিপরীতে একটি একীভূত, ঐক্যবদ্ধ এবং সমাধানমুখী রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

-পার্বত্য সময়