বাঙালি সদস্য ছাড়াই আগামী ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বিষয়ক টাস্কফোর্সের ১২তম সভা। ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)-এর আপত্তির পর প্রায় সাড়ে ৫৭ হাজার বাঙালি উদ্বাস্তু পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাঙালি সংগঠনগুলোর নেতারা। তাদের অভিযোগ, টাস্কফোর্সের অধিকাংশ সদস্য উপজাতীয় হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই বাঙালিদের স্বার্থের পরিপন্থী সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হচ্ছে। এতে পাহাড়ে প্রকৃত উদ্বাস্তুরা উপকৃত হওয়ার বদলে নতুন বৈষম্যের জন্ম নিচ্ছে।

টাস্কফোর্সের একমাত্র বাঙালি সদস্য এডভোকেট মহিউদ্দীন কবীরের পদত্যাগের পর পুরো কমিটিই এখন উপজাতীয় সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বাঙালিদের পুনর্বাসন বিষয়ে টাস্কফোর্সের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে বাঙালি প্রতিনিধি ছাড়া ফ্যাসিস্ট সরকারের নিয়োগকৃত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সভা আয়োজনের প্রতিবাদ ও গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাছাত্র সংসদ।

১৯৮০ ও ১৯৯০ দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে প্রায় ২৬ হাজার বাঙালি পরিবারকে সরকার গুচ্ছগ্রামে বন্দি করে উদ্বাস্তু করা হয়।

পক্ষান্তরে ১২ হাজার ২২৩ জন উপজাতীয় পরিবার ভারতে শরানার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। ভারতে আশ্রয় নেওয়া উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফেরত আনা ও পুনর্বাসনের জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির মধ্যে ১৯৯৭ সালের ৯ মার্চ ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির বাস্তবায়ন ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে সহায়তার জন্য ওই বছরই ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত পুনর্বাসন বিষয়ক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ১৬ সদস্যের এ টাস্কফোর্সে ১৬ সদস্যের মধ্যে পাহাড়ি সদস্য ৯ জন ও প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বাঙালি ৭ জন। তার মধ্যে বাঙালিদের থেকে নিয়োগ দেওয়া একমাত্র সদস্যও সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন।

কিন্তু টাস্কফোর্সের কার্যক্রমে বাঙালি অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমার প্রবল আপত্তি ও বিরোধিতার মুখে দীর্ঘ দুই দশক ধরে ঝুলে রয়েছে।

জানা গেছে, আগামী ২২ অক্টোবর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে টাস্কফোর্সের ১২ তম সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ঐ সভায় বাঙালিদের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তদের র পুনর্বাসনের পদক্ষেপ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা রয়েছে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ টাস্কফোর্সে বাঙালি সদস্যের পদটি শূন্য থাকায় এ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হবে কিনা, তা নিয়ে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা বিরাজ করছে।

এদিকে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমল নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুদত্ত চাকমার নেতৃত্বে “ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্স” সভা আয়োজনের প্রতিবাদ,গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদ।

শনিবার (১৯ অক্টোবর) সংগঠনের প্রচার সম্পাদক গাজী ইমরান গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন,সিনিয়র সচিব মর্যাদায় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত সুদত্ত চাকমা। টাস্কফোর্সের একমাত্র বাঙালি সদস্যও পদত্যাগ করেছেন। বাঙালি প্রতিনিধিবিহীন একটি পক্ষপাতদুষ্ট সভা আহ্বান করা সংবিধান ও প্রশাসনিক ন্যায়ের পরিপন্থী।

বিবৃতিতে দাবি করা হয়,সভায় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত বাঙালিদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে, যা পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। বিবৃতিতে অবিলম্বে টাস্কফোর্স সভা স্থগিত করাসহ ৫ দফা দাবী জাননো হয়। অন্য দাবিগুলো হচ্ছে,ফ্যাসিস্টের নিয়োগপ্রাপ্ত টাস্কফোর্স বাতিল করে নতুন করে গঠন,বাঙালি প্রতিনিধি পুনঃনিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত টাস্কফোর্সের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর না,অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত তালিকা থেকে বাঙালিদের নাম বাদ দেওয়ার যে কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা ওপার্বত্য চট্টগ্রামে সকল জাতিগোষ্ঠীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা। অন্যথায় বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে সাংবিধানিক পন্থায় তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়।

টাস্কফোর্সের সদস্য খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার গণমাধ্যমকে বলেন, খাগড়াছড়িতে ৯ মাসের কর্মে এটাই প্রথম ঐ সভায় যোগ দিতে যাচ্ছি।

টাস্কফোর্সে পদত্যাগ করার বাঙালি সদস্য এডভোকেট মহিউদ্দীন কবীর বলেন, আমাকে জোর করে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। আমি আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ পেয়েছি এ কারণে। তিনি বলেন,টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান নিজেও আওয়ামী লীগের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত। অথচ তিনি বহালে আছেন।

অনুসন্ধানের জানা গেছে, টাস্কফোর্সের কার্যক্রমের আওতায় ২০ দফা প্যাকেজের অধীনে ভারত প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২৩ জন উপজাতীয় শরণার্থী পরিবারকে রেশন হিসেবে প্রতি বছর ১৫ হাজার ৫১৪ দশমিক ২৬৯ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়। এছড়াও উপজাতীয় শরনার্থীরা দেশে ফেরত আসার পর মাত্র ছয় মাসের জন্য এ রেশন বিতরণের কথা থাকলেও, তা গত ২৮ বছর ধরে চলছে। এছাড়া গৃহ নির্মাণ, কৃষি অনুদান, ঋণ মওকুফ, জমি ফেরত, চাকরিতে পুনর্বহাল ও ক্ষতিপূরণ প্রদান, চাকরির নিয়োাগে অগ্রাধিকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ করা হয়েছে।

অপর দিকে বাঙালিদের পরিবারগুলোকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্তিকরণে ক্ষেত্রে টাস্কফোর্স কোন উদ্যোগ নেয়নি।

জানা গেছে, ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর টাস্কফোর্সের প্রাক্তন চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরার সভাপতিত্বে প্রথম সভায় ৮৯ হাজার ২৮০ উপজাতীয় ৫৭ হাজার ৬৯২ বাঙালি উদ্বাস্ত পরিবারের তালিকা পুনর্বাসনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। কিন্ত বাঙালিদের উদ্বাস্ত হিসেবে তালিকা অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই আপত্তি আসে।

পক্ষান্তরে সভাগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, তৎকালীন খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক ও জিওসির প্রতিনিধিরা "যিনি বাস্ত থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন তিনিই উদ্বাস্ত। এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি ও অ-বাঙালি সকলকে অন্তর্ভুক্ত রাখা বাঞ্ছনীয়" বলে বাঙালি উদ্বাস্তদের অন্তর্ভুক্তিকে 'যথাযথ' বলে অভিমত দিলেও জনসংহতি সমিতির আপত্তির কারণে বিষয়টি ঝুলে যায়।

২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর টাস্কফোর্সের চতুর্থ সভায় সন্তু লারমা নিজে উপস্থিত থেকে পূর্ববর্তী সভার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু সংজ্ঞা নির্ধারণে ১৯৯৮ সালের ২৭ জুনের টাস্কফোর্স সভার সিদ্ধান্ত অনুসরণ করার নির্দেশে হস্তক্ষেপে সিদ্ধান্ত বাতিল হয়!
১৯৯৮ সালের সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী "১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্ট হতে ১০ আগস্ট ১৯৯২ ইং পর্যন্ত বিরাজিত অস্থিতিশীল ও অশান্ত পরিস্থিতির কারণে যে সকল উপজাতি নিজ গ্রাম, মৌজা, অঞ্চল ত্যাগ করে স্বদেশের মধ্যে অন্যত্র চলে গেছেন বা চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন তারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে যে সকল অ-উপজাতীয় ব্যক্তিরা উপরোক্ত সময়ে বিরাজিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টি একই সাথে ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হবে"। এই সংজ্ঞার আলোকে চতুর্থ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, অ-উপজাতীয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকার ভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

তবে, এর মাত্র এক বছর পর ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পরবর্তী পঞ্চম সভায় সন্তু লারমা উপস্থিত হয়ে চতুর্থ সভার এই মানবিক সিদ্ধান্তটিও বাতিল করতে বাধ্য করেন। এর ফলে ৮৯ হাজার ২৮০ অ-বাঙালি উদ্বাস্তু পরিবারের পুনর্বাসন পক্রিয়ায় বহাল থাকলেও, ৫৭ হাজার ৬৯২ বাঙালি পরিবারের পুনর্বাসনের বিষয়টি বাতিল হয়ে যায়।

সর্বশেষ, ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ১১তম সভায় বাঙালি উদ্বাস্তদের পুনর্বাসনের যৌক্তিকতা উপস্থাপিত হলেও সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়া হয়।