সৌন্দর্যের হাতছানি ও অ্যাডভেঞ্চারের টানে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ছুটে যান বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে। তবে গত ৯ বছরে এই সৌন্দর্যের আবরণেই প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ২৭ জন পর্যটক। সবশেষ মঙ্গলবার (১৮ জুন) ভালুকিয়া খালে পাহাড়ি ঢলে ভেসে নিখোঁজ হন উখিয়ার তরুণ মেহেরাব হোসাইন (১৮)। এর মাত্র এক সপ্তাহ আগেই একইভাবে প্রাণ গেছে আরও তিন পর্যটকের।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর- এই বর্ষা মৌসুমে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। গত ৯ বছরে বর্ষাকালে ঝিরি-ঝরনা ও ঢলে ভেসে প্রাণ গেছে ১৩ জনের। শুকনা মৌসুমে নদী বা বগালেকে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন এবং সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩ জন।
মৃতদের বড় অংশই ছিলেন কিশোর ও তরুণ। ২০১৯ সালের আগস্টে থানচির জিন্নাহপাড়ায় আটকে পড়েছিলেন ১৬ তরুণ-তরুণী। তাঁদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল স্থানীয়দের সহায়তায়।
রুমা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি, ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৯ জুন পাইন্দু ইউনিয়নের তিনের সাইথার ঝরনায় ভেসে যান নৌবাহিনীর সাব লেফটেন্যান্ট সাইফুল্লাহ ও একজন কলেজছাত্রী।
২০১৭ সালে রিজুক ঝরনায়, ২০১৬ সালে বগালেকে এবং ২০১৮ সালে সাঙ্গু নদীতে গোসলে নেমে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেওক্রাডং ও থানচিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিন নারী পর্যটক।
গত ১২ আগস্ট আলীকদমে মারা যান ট্যুর কোম্পানি 'ট্যুর এক্সপার্ট'–এর কর্ণধার আতাহার ইসলাম। এরপর তার স্ত্রী বর্ষা ইসলাম প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেন। সম্প্রতি ওই সংস্থার ব্যবস্থাপনায় রংরাং ও ক্রিস্টং পাহাড় ভ্রমণে গিয়ে তিন পর্যটকের মৃত্যু হয়। বর্ষা ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি জামিনে রয়েছেন।
রুমা থানার ওসি মো. সোহরাওয়ার্দী বলেন, “সমতলের মানুষ পাহাড়ের বাস্তবতা বোঝেন না। বর্ষায় ঢল নামা, পিচ্ছিল পাথর কিংবা হঠাৎ পাহাড় ধস সম্পর্কে তাদের কোনো পূর্বজ্ঞান থাকে না। উপরন্তু অনেকেই স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা কিংবা গাইডদের পরামর্শ মানেন না।”
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মুমিন সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোকে জানান, “সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি পর্যটন দলের তথ্য রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। ১০ জনে ১ জন অনুমোদিত গাইড থাকার কথা। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান গোপনে এই নিয়ম ভেঙে পর্যটকদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
পুলিশ বলছে, পাহাড়ে অপহরণ, ছিনতাই বা যৌন সহিংসতার ঘটনা তুলনামূলক কম। গত ৯ বছরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৫টি এবং নারী পর্যটকের ওপর সহিংসতার ঘটনা ২টি, যার মধ্যে এক তরুণীর মৃত্যুও হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বান্দরবান ভ্রমণ এখন একপ্রকার ‘রুলেট খেলা’র মতো হয়ে উঠেছে অনেকের জন্য। নিয়ম মেনে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে, গাইডসহ ভ্রমণ না করলে এই মৃত্যু তালিকা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
-পার্বত্য সময়


