রিয়াজুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের অবাঙালি জাতিসত্তার অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অন্যতম প্রধান কান্ডারি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংপতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা)। যে নেতার হাত ধরে এ সংগ্রাম এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল, তাকেই প্রাণ দিতে হয়েছিল নিজ সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নৃশংসতার শিকার হয়ে। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর, এম এন লারমাসহ আট সঙ্গীর নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি ছিল পাহাড়ের সশস্ত্র সংগ্রামে আদর্শচ্যুতির ও ভ্রাতৃঘাতি সন্ত্রাসবাদের এক নগ্ন উন্মোচন।

সংগ্রামের সূচনা থেকে সশস্ত্র পথ
রাঙামাটির মহাপুরম গ্রামে ১৯৩৯ সালে জন্ম নেওয়া এম এন লারমা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন। কাপ্তাই বাঁধের কারণে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। অবাঙালি জাতিসত্তার স্বতন্ত্র সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে তিনি ছিলেন আপসহীন। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে সকল নাগরিককে ‘বাঙালি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার প্রতিবাদে তিনি গণপরিষদ থেকে ওয়াকআউট করেন। তার বিখ্যাত উক্তি, "আমি একজন চাকমা... আমার বাপ, দাদা চৌদ্দপুরুষ কেউ বলে নাই- আমি বাঙালি," আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত পরিচয়ের সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক দলিল।

এই স্বতন্ত্র পরিচয়ের সংগ্রামকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তিনি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং পরবর্তীকালে এর সশস্ত্র শাখা 'শান্তিবাহিনী'। মাওবাদী দর্শনে বিশ্বাসী লারমা ‘বন্ধুকের নলই ক্ষমতার উৎস’- এই তত্ত্বে আস্থা রেখে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেন। কিন্তু যে আদর্শিক ভিত্তি থেকে এই সংগ্রামের শুরু, তা অচিরেই পথ হারায় ছড়িয়ে পড়া সন্ত্রাসবাদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দুর্নীতি আর চরম অবিশ্বাসের অন্ধকারে।

বিভক্তি ও নৃশংসতা
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়া এম এন লারমার শেষ দিনগুলো সুখকর ছিল না। শান্তিবাহিনীর অভ্যন্তরেই আদর্শগত বিরোধ, নেতৃত্বের কোন্দল এবং ক্ষমতা দখলের অভিলাষ একসময় চরম আকার ধারণ করে। এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনই শেষ পর্যন্ত ডেকে আনে ১০ নভেম্বরের সেই কালরাত।

লারমার মৃত্যুর পর শান্তিবাহিনী আড়াআড়িভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বিবদমান দুই পক্ষ- এম এন লারমার ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) এবং অপর শীর্ষ নেতা প্রীতি কুমার চাকমা (প্রকাশ)। প্রকাশ্যে পরস্পরকে দায়ী করে লিফলেট ও বিবৃতি প্রকাশ করে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগপত্রগুলোতেই পাহাড়ের তৎকালীন সন্ত্রাসবাদের নৃশংস চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সন্তু লারমার অভিযোগ
১৯৮৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত বিবৃতিতে সন্তু লারমা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রীতি কুমার চাকমা, দেবজ্যোতি চাকমা (দেবেন), ভবতোষ দেওয়ান (গিরি) সহ একটি চক্রকে দায়ী করেন। তার ভাষ্যমতে- "পার্টির অভ্যন্তরে একশ্রেণীর ক্ষমতা লিপ্সু, দুর্নীতিপরায়ণ, স্বাথান্বেষী ও প্রতিক্রিয়াশীল" নেতারা এই চক্রান্তের হোতা। তারা "দেশী-বিদেশী, আন্তর্জাতিক গুপ্তচর ও রাজনৈতিক দালালদের খপ্পরে পড়ে" এই ষড়যন্ত্র করে। বিভেদ নিরসনে "ক্ষমা করা ও ভুলে যাওয়া" নীতির ভিত্তিতে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হলেও, সেই সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে "গিরি-প্রকাশ-পলাশ চক্র" অতর্কিত হামলা চালায় এবং "জাতীয় ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ইতিহাস রচনা" করে।

প্রীতি কুমার চাকমার পাল্টা ভাষ্য
অপরদিকে, ১৯৮৪ সালের ২৩ জানুয়ারি 'জাতির উদ্দেশ্যে জনসংহতি সমিতি' শিরোনামে প্রীতি কুমার চাকমার প্রকাশিত বিবৃতিতে এই ঘটনার জন্য সরাসরি "লারমা চক্র" বা এম এন লারমা ও তার অনুসারীদের দায়ী করা হয়। তার ভাষ্যমতে- পার্টিতে "দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব... ও বাস্তব বিবর্জিত মনগড়া রাজনৈতিক তত্ত্ব" বিরাজমান ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন লারমা। ১৯৮২ সালের সম্মেলনে সংস্কারের দাবি উঠলেও লারমা চক্র তা প্রতিহত করতে "তোষামোদকারী ও সুবিধাভোগী কর্মীদের" ব্যবহার করে। সমস্যা সমাধানে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে শ্রী গিরিকে (ভবতোষ দেওয়ান) পার্টির সদর দফতরে ডেকে আনা হলেও, লারমা তাকে "আটক করে রাখা" এবং "মানসিক নিযাংতন" চালান।

প্রীতি চাকমা অভিযোগ করেন, লারমাই প্রথম "ভ্রাতৃঘাতি সংঘর্ষের" জন্ম দেন এবং তিনি এম এন লারমার একটি চিঠির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করেন, যেখানে লারমা "অশান্তিপূর্ণভাবে সমাধান" এবং "পূর্ণ সফলতা" অর্জনের কথা লিখেছিলেন।

লারমা তার অনুসারীদের "আমার হুকুম, তোমরা যেখানে পাও বাকিদেরকে গুলি করো- হত্যা করো" বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে প্রীতি চাকমা তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেন।

সন্ত্রাসবাদের নগ্ন নজির
এই দুটি বিবৃতি বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়, এম এন লারমার হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার করুণ পরিণতি, যেখানে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশ, ক্ষমতার লোভ এবং সশস্ত্র দাপটই মুখ্য হয়ে উঠেছিল। "গুপ্তচর", "ষড়যন্ত্র", "হত্যা করো", "আটক", "নির্যাতন"—এই শব্দগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহার নয়, বরং একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ পচন ও সন্ত্রাসবাদী মনোভাবকেই প্রকাশ করে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, সন্তু লারমা বা প্রীতি কুমার চাকমার মধ্যে কে সত্য বলছেন, সেই বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট- যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল জাতিগত অধিকার আদায়ের জন্য, তা নিজ প্রতিষ্ঠাতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। এম এন লারমার মৃত্যু অবাঙালি জাতিসত্তার ঐক্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল এবং উন্মোচন করে দিয়েছিল সেই নগ্ন সত্যটি, যেখানে আদর্শের নামে সন্ত্রাসবাদই হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। এই হত্যাকাণ্ড তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে সন্ত্রাসবাদের এক নৃশংস ও কলঙ্কিত নজির হয়েই থাকবে।