দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলধারা ও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মৎস্য উৎপাদন ক্ষেত্র রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ। যা দেশের মিঠা পানির মাছের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে আমেরিকার অর্থায়নে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। ১৯৬২ সালে এর নির্মাণ শেষ হয়। এরপর পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি ডুবে যায় এবং এ হ্রদের সৃষ্টি হয়। এর পর থেকে চাকমা রাজবাড়িসহ হাজার হাজার পরিবার উদ্ধাস্তু হলেও সৃষ্টি হয় মাছের বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র, উৎপাদিত হয় বিদ্যুৎ। বাণিজ্যিক কারণে হ্রদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে দিন দিন। যার সুফল ভোগ করছেন এ অঞ্চলের ২২ হাজারেরও অধিক মৎস্যজীবী। এ হ্রদ থেকে আহরিত মাছ রপ্তানি করা হয় চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। অর্থনীতির বড় একটি চালিকা শক্তি বৃদ্ধি হতে থাকায় তা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) সূত্রে জানা গেছে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা শুরু পর দিন দিন বাড়ছে মৎস্য আহরণ। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এক মাসে প্রায় মৎস্য বিপণন কেন্দ্রে মাছ অবতরণ করা ১,৯৪২,৯৭৩ মেট্রিক টন। যা থেকে দেশের রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ কোটি ৯৯ লক্ষ ৯১ হাজার ৪৮৯ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে মৌসুমের প্রথম মাসে মৎস্য বিপণন কেন্দ্রে মাছ অবতরণ করা হয়েছিল ১,৯২৫,৩৪৪ মেট্রিক টন। যার রাজস্ব আয় ছিল ৩ কোটি ৯৪ লক্ষ ৫৩ হাজার ৭৯০ টাকা। গত বছরের তুলনায় এবছর প্রথম মাসে মৎস্য আহরণ করা হয়েছে ১৭ হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন এবং রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫ লক্ষ ৩৭ হাজার ৬৯৯ টাকা। সুতারাং গত বছরের চেয়ে এ বছর প্রথম মাসে মৎস্য আহরণ এবং রাজস্ব আদায় বেশি হয়েছে।
বিএফডিসি আরও জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে হ্রদ থেকে মাছ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার টন। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম মাসেই দুই হাজার টনের কাছাকাছি মাছ সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে প্রথম মাসে মৎস্য বিপণন কেন্দ্রে মাছ অবতরণ করা হয়েছিল ২,০৪৬,৩৫৮ মেট্রিক টন। এর থেকে রাজস্ব আদায় করা হয়,৪ কোটি ২১ লক্ষ ৯৯ হাজার ৩৪৭ টাকা। ২০২১-২২ অর্থ বছরে প্রথম মাসে মৎস্য বিপণন কেন্দ্রে মাছ অবতরণ করা হয়েছিল ১,৭২৪,২৯৫মেট্রিক টন। এর থেকে রাজস্ব আদায় করা হয়,৩ কোটি ১৬ লক্ষ ৩৯ হাজার ১২৯ টাকা। ২০২০-২১ অর্থ বছরে প্রথম মাসে মৎস্য বিপণন কেন্দ্রে মাছ অবতরণ করা হয়েছিল ১,৭৪৮,৮৩১মেট্রিক টন। এর থেকে রাজস্ব আদায় করা হয়,৩ কোটি ২০লক্ষ ৫৫ হাজার ৫১৩ টাকা।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) রাঙ্গামাটি অঞ্চলের হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কমান্ডার মোঃ আশরাফুল আলম ভুঁইয়া পার্বত্য সময়কে জানান, কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য উৎপাদন প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি রাজস্ব পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে তেমনি স্থানীয় মানুষের আমিষের যোগান দেয়াও সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি এই এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে হ্রদের মাছ ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।
উল্লেখ্য,পহেলা মে দেশের সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলরাশি রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন, পোনা মাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণসহ কাপ্তাই হ্রদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে তিন মাসের জন্য হ্রদ হতে সকল প্রকার মৎস্য আহরণ, বাজারজাতকরণ এবং পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, বিএফডিসি ও রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন। এরপর ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
- -পার্বত্য সময়


