বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষের একমাত্র স্বাস্থ্যসেবার ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটি বহুদিন ধরে জনবল ও সরঞ্জামের সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পুরো হাসপাতাল চালাচ্ছেন মাত্র একজন চিকিৎসক। এর ফলে গত পাঁচ বছরে চিকিৎসাধীন ও রেফার্ড করা অন্তত ২৪ জন রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
১৯৯৫ সালে ৩১ শয্যার থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যাত্রা শুরু করে, পরে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। নিয়ম অনুযায়ী এখানে ১২ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র দুইজন। তাদের মধ্যে একজন ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন। ফলে হাসপাতালের সব দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে একাই অপর চিকিৎসককে।
একইভাবে নার্সের ১৮টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। চারজন মিডওয়াইফ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে একজনও নেই। আধুনিক কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা বা ল্যাবরেটরি সুবিধাও নেই হাসপাতালে।
প্রসূতি মা, শিশু ও বৃদ্ধ রোগীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও নদীপথ পেরিয়ে অনেকে যখন হাসপাতালে পৌঁছান, তখনও চিকিৎসা না পেয়ে আবার বান্দরবান সদর হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। দীর্ঘ পথ ও ভ্রমণক্লান্তির কারণে অনেকেই মাঝপথেই মৃত্যুবরণ করেন।
২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ১৯৮ জন রোগী। তাদের মধ্যে ৪৫৬ জনকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে রেফার্ড করতে হয়েছে। ভর্তি অবস্থায় মারা গেছেন ১৭ জন। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক মংক্যসিং মারমা জানান, “২০১৯ সালে যোগদানের পর অন্তত সাতজন রোগী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে আমার অ্যাম্বুলেন্সেই মারা গেছেন।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে ডাক্তার-ওষুধের সংকট বহুদিন ধরে চলছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বদলি হলেও থানচিতে যোগ দেন না, সদর হাসপাতালে থেকে যান। ফলে আমরা পাহাড়ি-বাঙালি সবাই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে আমিসহ দুইজন চিকিৎসক আছি। তবে একজন দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। ফলে একাই পুরো হাসপাতাল চালাতে হচ্ছে আমাকে। জনবল আর সরঞ্জাম সংকটের কারণে গুরুতর রোগীদের রেফার্ড করা ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু দীর্ঘ পথের কারণে অনেকে জীবিত অবস্থায় সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না।
বান্দরবান জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, শুধু থানচি নয়, তিন পার্বত্য জেলাতেই চিকিৎসক সংকট প্রকট। নতুন ডাক্তার পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। তবে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে কয়েকজন চিকিৎসককে বান্দরবানে বদলির চেষ্টা চলছে।

-পার্বত্য সময়