পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের ভূখণ্ডের এক অবিচ্ছেদ্য এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আমাদের যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি সেখানকার ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা সমীকরণও আমাদের সমানভাবে ভাবিয়ে তোলে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সমাজ যখন একটি প্রগতিশীল ধারা বজায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি জনপদগুলোতে এক গভীর ও অশুভ ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে। গত ২৮ জুন বান্দরবান রিজিয়নের আওতাধীন অত্যন্ত দুর্গম রেতলাং এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বিশেষ অভিযান আমাদের এই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএফ) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসিত)-এর একটি যৌথ গোপন আস্তানায় সেনাবাহিনীর এই হানা প্রমাণ করে পাহাড়ের শান্তি বিনষ্টকারী শক্তিগুলো এখন একজোট হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।

তাত্ক্ষণিকভাবে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা তীব্র গোলাগুলি শুরু করে এবং একপর্যায়ে গহীন অরণ্যে পালিয়ে যায়। আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, অভিযানের কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থে এই মুহূর্তে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও, বর্তমানে চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চলমান রয়েছে। এই ধরনের সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্যত্র যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর ও অপপ্রচারমূলক তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

কিন্তু এই সংঘাতের গভীরতা কেবল একটি সামরিক অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে পাহাড়ের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে গড়ে তোলা এক সমান্তরাল অপরাধী অর্থনীতি। দীর্ঘদিন ধরে কেএনএফ ও ইউপিডিএফের মতো গোষ্ঠীগুলো পার্বত্য অঞ্চলে কায়েম করেছে একচ্ছত্র চাঁদাবাজির রাজত্ব। সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জুম চাষী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার- সবার ওপরই নেমে আসে এই সশস্ত্র চাঁদাবাজদের নির্মম জুলুম। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জোটে অপহরণ, নির্যাতন কিংবা মৃত্যু। সাধারণ মানুষের এই ত্রাসের রাজত্ব ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রধান প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাহাড়ের প্রান্তিক মানুষের মানবাধিকার রক্ষা এবং এই চাঁদাবাজির অর্থনীতিকে গুঁড়িয়ে দিতে সেনাবাহিনীর যে কঠোর অবস্থান, সেটাই মূলত এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে মরিয়া করে তুলেছে।

এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতিকে সরলীকরণ করার সুযোগ নেই। এটি মূলত রূপ নিয়েছে দেশের অভ্যন্তরে এক ‘ছোট যুদ্ধে’। সম্প্রতি কেএনএফ ও ইউপিডিএফ (প্রসিত) গ্রুপের সাথে সেনাবাহিনীর একাধিক সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা কোনো সাধারণ আইন-শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়। এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমারেখা রক্ষার লড়াই। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সম্মুখভাগে থেকে দেশের বীর সেনারা যে আত্মত্যাগ করছেন, তা নজিরবিহীন। এই চলমান লড়াইয়ে দেশের অখণ্ডতা রক্ষা করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর একজন অফিসার এবং একজন সৈনিক গুরুতর আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বীর সেনাদের সাহসিকতাপূর্ণ পাল্টা জবাবে নিহত হয়েছে চারজন কুখ্যাত কেএনএফ সন্ত্রাসী।

পাহাড়ের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ‘দেশভাগের’ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ষড়যন্ত্র। একটি কুচক্রী মহল এই দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে খণ্ড-বিখণ্ড করার অলীক স্বপ্নে বিভোর। তারা সরল-সোজা পাহাড়ি তরুণদের মগজ ধোলাই করে, বিপুল অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে। এই অপশক্তিকে কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে কেবল পার্বত্য অঞ্চল নয়, সমগ্র দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাঙালি নির্বিশেষে সকল বাংলাদেশীর জীবন ও সম্পদের শেষ ভরসাস্থল। প্রতিকূল আবহাওয়া, পাহাড়ি ম্যালেরিয়া এবং অদৃশ্য বুলেটের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তারা দিন-রাত পাহারা দিচ্ছেন আমাদের সীমান্ত। দেশভাগের এই দেশদ্রোহী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সন্ত্রাসীদের বাংলার মাটি থেকে সম্পূর্ণ বিতাড়িত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সন্ত্রাসী নির্মূলে সেনাবাহিনীর এই দৃঢ় ও চলমান কার্যক্রমই আমাদের আশ্বস্ত করে যে, বাংলাদেশের এক ইঞ্চি জমিও কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির আস্তানা হতে দেওয়া হবে না। পাহাড়ের বুকে শান্তি, স্বস্তি ও দেশের অখণ্ডতা বজায় রাখতে এই লড়াইয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের উচিত সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়ানো এবং যেকোনো ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সজাগ থাকা।