পার্বত্য বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে স্থানীয় ম্রো জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ম্রো সম্মেলন-২০২৬’। দিনব্যাপী এ আয়োজনে শান্তি, নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের বার্তা তুলে ধরার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশা নিয়ে মতবিনিময় করেন নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন ও স্থানীয় নেতৃত্ব।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড ও বান্দরবান রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, এসপিপি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি।

অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিভিন্ন পাড়া থেকে আসা ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়। এ সময় তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, কৃষি, নিরাপদ পানি, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেন।

রিজিয়ন কমান্ডার প্রতিনিধিদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বাস্তবসম্মত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

সম্মেলনে আলীকদম জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আশিকুর রহমান আশিক, এসপিপি, পিএসসি, ৫৮ ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কারবারী, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, নারী ও যুব প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পাড়া থেকে আসা প্রায় ১ হাজার ২০০ জন ম্রো জনগোষ্ঠীর সদস্য অংশ নেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন শুধু নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণও অপরিহার্য। তিনি ম্রো জনগোষ্ঠীকে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-জীবিকা পরিচালনা, সন্তানদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ২০১৫ সালে কুরুকপাতায় যে শান্তির দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের মাধ্যমে সেই শান্তির ধারাবাহিকতাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

রিজিয়ন কমান্ডার উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে কুরুকপাতায় ম্রো ন্যাশনাল পার্টির ৭৯ জন সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ম্রো সোশ্যাল কাউন্সিলের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সম্পন্ন হওয়া ওই ঘটনাকে তিনি পাহাড়ে শান্তির পথে ফিরে আসার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ম্রো সমাজের দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, জনগণের সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। এ শান্তির ইতিবাচক ধারাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, “শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন তিনটি একই সুতোয় গাঁথা।” আলীকদমে ম্রো, মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙালিসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এ অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে তিনি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে এ সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। বান্দরবান রিজিয়ন ও আলীকদম সেনাজোন জনগণের নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলেও তিনি জানান।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তারা ভবিষ্যতেও নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে এ ধরনের মতবিনিময় এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।