রিয়াজুল ইসলাম

গত ১৫ আগস্ট দিল্লিভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম 'চাকমা রিপোর্টার'-এ আয়োজিত একটি ভার্চ্যুয়াল আলোচনার দিকে নজর দিলে যেকোনো সচেতন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মনে শঙ্কা জাগ্রত হতে বাধ্য। "পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ৮০তম বার্ষিকী" শীর্ষক সেই আলোচনায় ভারত ও বাংলাদেশে সক্রিয় কতিপয় ব্যক্তির যে বক্তব্য প্রকাশ্যে এসেছে, তা কেবল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার ওপর সরাসরি আঘাতই নয়, বরং এক দূরপ্রসারী ও বিপজ্জনক ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অনভিপ্রেত বহিঃপ্রকাশ।

উক্ত আলোচনায় অধ্যাপক গৌতম চাকমা, বিধায়ক রসিক মোহন চাকমা, প্রীতিময় চাকমা এবং ইউপিডিএফ (প্রসীত) সদস্য সুহাস চাকমার মতো ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতের অংশ করার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। যে অঞ্চলটি জন্মলগ্ন থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড দখল করে আছে, তাকে "ঐতিহাসিক ভুল" হিসেবে আখ্যা দিয়ে ভারতের সাথে যুক্ত করার প্রকাশ্য আহ্বান কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে না। এটি এক চরম উসকানিমূলক পদক্ষেপ, যার আসল লক্ষ্য- বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিনাশ করা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা।

বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ
উক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের মূল সুর ছিল একটাই- পার্বত্য অঞ্চলকে বাংলাদেশ থেকে আলাদা করে ভারতের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা। বক্তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ ও রেডক্লিফ রোয়েদাদের দোহাই দিয়ে এটি বোঝাতে চেয়েছেন যে, অত্র অঞ্চলের মানুষ কখনোই নিজেদের ‘বাংলাদেশী’ হিসেবে গ্রহণ করেনি। তবে বাস্তব সত্য হলো, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ শান্তিপ্রিয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর নয়; বরং বহিরাগত ও স্বার্থান্বেষী মহল এবং ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থানরত একদল বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার দূরভিসন্ধি।

সুহাস চাকমা এবং রসিক মোহন চাকমার মুখে ‘জুম্ম ন্যাশনালিজম’ এবং একবদ্ধ আন্দোলনের বয়ান স্পষ্ট করে দেয় যে, বিগত কয়েক দশক ধরে তথাকথিত আঞ্চলিক অধিকার রক্ষার নামে যে সশস্ত্র কিংবা রাজনৈতিক তত্পরতা চালোনো হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য কখনই অধিকার আদায় ছিল না। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সবসময়ই ছিল সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশকে বিভক্ত করা এবং ভারতকে সেই সুযোগ করে দেওয়া।

রাজনীতির নতুন ঘুঁটি: হাসিনাকে ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহারের পায়তারা
আলোচনার সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ও বিস্ময়কর অংশটি ছিল প্রীতিময় চাকমার বক্তব্য, যেখানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত ও ভারতে আশ্রয়রত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ফিরিয়ে আনার জন্য পাহাড়ের মানুষদের জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানান। প্রস্তাবটি এমনভাবে পেশ করা হয় যে, একদিকে পার্বত্য শান্তি চুক্তির দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনার পক্ষে পাহাড়ের অধিবাসীদের সংগঠিত করা হবে, আর তাতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ থেকে অঞ্চলটিকে বিচ্ছিন্ন করাই হবে তাদের যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ!

এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ভারতের মাটিতে বসে আশ্রিত ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো পরস্পর হাত মিলিয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়কে মূলত বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিতিশীলতা তৈরির এক মোক্ষম ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করার ঘৃণ্য ছক কষা হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট শক্তিকে পুনর্বাসনের শর্ত হিসেবে যখন দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়, তখন তা জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য এক চরম হুমকি হিসেবে দেখা দেয়।

উপজাতীয় উপদলীয় কোন্দল থেকে একমুখী বিচ্ছিন্নতাবাদ
পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও রক্তপাতে লিপ্ত। তবে দিল্লিভিত্তিক এই ওয়েবিনারে ভারত থেকে যেভাবে জেএসএস (সন্তু) এবং ইউপিডিএফ (প্রসীত)-কে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হলো, তা এক নতুন সতর্কসংকেত। এটি স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ভুলে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী উপাদানগুলোকে একটি একক 'ভারতপন্থী অ্যান্টি-বাংলাদেশ' প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার পরিকল্পিত চেষ্টা বিদেশি মাটি থেকে চালনা করা হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কোনো উপহারে পাওয়া বা লিজ নেওয়া অঞ্চল নয়; এটি বাংলাদেশের রক্তে অর্জিত মানচিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও যদি বিদেশি মাটিতে বসে কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয় এবং ওপেন প্ল্যাটফর্মে ভূখণ্ড দখলের উসকানি দেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের চুপ করে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সরকারকে এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এবং কূটনৈতিকভাবে কঠোর বার্তা দিতে হবে। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যেভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী এজেন্ডা ও উসকানি ছড়ানো হচ্ছে, তা দুই দেশের প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের পরিপন্থী। একই সাথে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ জনগণকেও অনুধাবন করতে হবে যে, বিদেশি ভূ-রাজনৈতিক খেলার হাতিয়ার হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎকে তারা যেন কোনো চরম বিপদের মুখে ঠেলে না দেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ছিল, আছে এবং চিরকাল থাকবে। এ ভূখণ্ড নিয়ে সীমান্ত পারের যেকোনো ষড়যন্ত্রকে সমগ্র দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে শক্ত হাতে দমন করাই এখন সময়ের দাবি।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও অনলাইন এক্টিভিস্ট