বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রি মুখ এলাকায় ১৬ ও ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত “আরাকা ওয়াটার ফেস্টিভাল”-এ মিয়ানমারভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির সরাসরি অংশগ্রহণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা কাঠামো এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। উৎসবে ছিল তাদের ইউনিফর্ম পরিহিত অস্ত্রধারী সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ সমর্থন। এমন একটি অনুষ্ঠান কেবল সাংস্কৃতিক বিনিময়ের আড়ালে একটি কৌশলগত শক্তি প্রদর্শন এবং ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউএলএ -এর নেতা ও রাখাইন সংঘাতে মূল পরিকল্পনাকারী লাভ্রে ( কুখাই রাখাইন), রাজনৈতিক শাখার মুখপাত্র মং থুইহ্লা মারমা, এবং সামরিক শাখার কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জোকা ও ক্যাপ্টেন ক্যজো রাখাইন। তাদের সঙ্গে ছিলেন অন্তত ৭০০ থেকে ৮০০ অংশগ্রহণকারী, যাদের অনেকেই মিয়ানমার থেকে আগত। উৎসবজুড়ে ছিল আরাকান আর্মির প্রতীক, উড়ানো হয় রাখাইন পতাকা, বাজানো হয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গান। রীতিমতো মঞ্চে উঠে বক্তব্য দেন আরাকান আর্মির সদস্যরা, যেখানে তারা প্রকাশ্যেই নিজেদের সংগঠনকে ‘সমর্থনের কেন্দ্র’ হিসেবে তুলে ধরেন।
স্থানীয় পর্যায়ে এই উৎসবে সহায়তা ও উপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে থানচি উপজেলা বিএনপির সভাপতি খামলাই ম্রো, রেমাক্রি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুই শই থুই মারমা রনি, তিন্দু ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মংপ্রু মারমা এবং জেএসএস যুব শাখার নেতা নুমংপ্রু মারমার বিরুদ্ধে। তাদের কেউ কেউ মঞ্চে উঠে আরাকান আর্মির প্রশংসা করে বক্তব্য দেন। "মেম্বার পরিবার" লেখা টি-শার্ট পরে অংশগ্রহণকারী দলের ছবি থেকে স্পষ্ট যে স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি এই উৎসবকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়োজন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি আরাকান আর্মির একটি সুসংগঠিত, পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত “নরম অনুপ্রবেশ” কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আদর্শিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক গোয়েন্দা প্রধান ব্রিগেডিয়ার (অব.) রোকন উদ্দিন গণমাধ্যমে বলেন, “এই উৎসব মূলত একটি ছদ্মবেশী রাজনৈতিক বার্তা। রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সামনে রেখে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি ‘শ্যাডো স্টেট’ গঠনের পূর্বাভাস দিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “রাখাইন জনগোষ্ঠীর সাথে মারমা সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে আরাকান আর্মি এ অঞ্চলে নিজেদের জনভিত্তি গড়ে তুলছে। এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য সশস্ত্র প্রশিক্ষণ, চরমপন্থী সংযোগ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি প্রস্তুতের প্রক্রিয়া।”
আরাকান আর্মির উপস্থিতি সম্পর্কে আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকলেও বিজিবি কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং বিজিবির কিছু সদস্যকে উৎসবে দায়িত্ব পালন করতেও দেখা গেছে। বিজিবি গোয়েন্দা প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াসির জাহান হোসেন এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আরাকান আর্মি এই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি।” কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে আরাকান আর্মির ইউনিফর্মধারী সদস্যদের উপস্থিতি, মঞ্চে ভাষণ এবং নাচ-গানের দৃশ্য তার বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি হয় প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নয়তো রাজনৈতিক নির্দেশনার ভিত্তিতে সচেতন নিষ্ক্রিয়তা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের এই নিষ্ক্রিয়তা কেবল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে একধরনের নীতিগত দুর্বলতা ও বিভ্রান্তির ইঙ্গিত বহন করে। তাই এই ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা এবং দ্রুত তদন্তপূর্বক দায়িত্ব নির্ধারণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এখন দুটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে- প্রথমত, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে একটি বিদেশি সশস্ত্র সংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রমকে রাষ্ট্র কীভাবে দেখছে? দ্বিতীয়ত, পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সম্ভাব্য “ছায়া রাষ্ট্র” গঠনের চেষ্টাকে রুখে দেওয়ার মতো কূটনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি রাষ্ট্রের কতটুকু আছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আয়োজনকে উপেক্ষা করলে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে চরমপন্থী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর জন্য। এটি শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের আঞ্চলিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। ভবিষ্যতে এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সীমিত হয়ে পড়ে।
তবে শেষ মুহূর্তে প্রশাসনের দিক থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সম্প্রতি গণমাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তৃত খবর প্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত গড়ে ওঠার পর নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মির প্রবেশ ও চলাচলের পথ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ (১৬ এপ্রিল) থেকেই সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার যোগাযোগ, যাতায়াত ও আবাসন ব্যবস্থায় নজরদারি শুরু করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধুমাত্র প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভূখণ্ড হিসেবে কেবল মানচিত্রেই নয়, বাস্তবিক অর্থেও নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যথায়, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি ‘নির্মম শুরু’ হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হতে পারে।

-পার্বত্য সময়