প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পার্বত্য জেলা বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার আলো। রোয়াংছড়ি উপজেলার আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের চুয়ানবিল পাড়ায় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়, যা স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে।
দুর্গম এ পাড়াটিতে ২৫টি পরিবার বসবাস করে, যেখানে প্রায় ২৫-৩০ জন শিশু রয়েছে। এতদিন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে বান্দরবান সেনা রিজিয়নের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় এবং সেনা জোনের প্রচেষ্টায় ২০২৪ সালের ৬ জানুয়ারি ‘চুয়ানবিল পাড়া প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়’ চালু হয়। বর্তমানে সেখানে ১৫ জন শিশু প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
শিক্ষার নতুন সূচনা
পাড়ার কারবারি মুন সাং বম জানান, ১৯৮০ সালে স্থানীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এলাকার একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় কচ্ছপতলী এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে এখানকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ একেবারেই সীমিত হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় পুনরায় বিদ্যালয় চালু হওয়ায় তারা অত্যন্ত আনন্দিত।
সড়ক যোগাযোগের অনুপস্থিতি এবং বর্ষায় খরস্রোতা তারাছা খালের কারণে এলাকাটি একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। ফলে শিশুদের রোয়াংছড়ি সদর বা কচ্ছপতলীতে গিয়ে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ তাদের শিক্ষা গ্রহণকে সহজ করে দিয়েছে।
বিদ্যালয় উদ্বোধন ও প্রথম কার্যক্রম
মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিদর্শনে যান বান্দরবান সেনা জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএসএম মাহমুদুল হাসান ও তার টিম। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চুয়ানবিল পাড়ায় পৌঁছানোর পর সেনা কর্মকর্তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান স্থানীয়রা। পরিদর্শনকালে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে, যা এই এলাকার শিশুদের জন্য প্রথম অভিজ্ঞতা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক লাল য়ইথাং বম বলেন, ‘‘এখানে শিশুরা কখনোই শহরে গিয়ে পড়ার সুযোগ পেত না। সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ তাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করবে।’’
এক অভিভাবক মিরাম ময় বম বলেন, ‘‘দূরত্বের কারণে আমি নিজের পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। কিন্তু এখন আমার ছেলে-মেয়েরা এখানেই স্কুলে যেতে পারছে। এজন্য সেনাবাহিনীর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’’
সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সেনা জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএসএম মাহমুদুল হাসান জানান, অভিযানিক কাজের সময় এলাকাটিতে শিক্ষার অভাব চোখে পড়ে। পরে স্থানীয়দের অনুরোধে সেনাবাহিনী বিদ্যালয় স্থাপন করে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘এই বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিশুরা প্রথমবারের মতো জাতীয় সংগীত গাইছে এবং দেশের পতাকা সামনে রেখে পড়াশোনা করছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।’’
বিদ্যালয়ের জন্য একজন পুরুষ ও একজন নারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের বেতন সম্প্রীতি উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের বইসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তারা আশা করছেন, এভাবে পাহাড়ের অন্যান্য দুর্গম এলাকাতেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়বে। সেনা জোন অধিনায়ক আশ্বাস দিয়েছেন, ভবিষ্যতেও দুর্গম অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে সেনাবাহিনী এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।
-পার্বত্য সময়


