খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ওয়াচুতে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে এক ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—‘বিন্দু বিদ্যানিকেতন’। যেখানে একসময় মাধ্যমিক শিক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না, আজ সেখানে ছেলেমেয়েরা শুধু পাঠ্য বই নয়, শিখছে প্রকৃতি, শিল্পকলা, নাট্যচর্চা ও কৃষিকাজও।
মাটিরাঙা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরের ওয়াচু গ্রামের আশপাশে অন্তত দশটি পাড়া—১, ২, ৩, ৪ নং রাবার বাগান, কাইলাংশি পাড়া, তৈকুম্বা পাড়া, গনচন্দ্র কার্বারি পাড়া, শিশক পাড়া, চিলোক পাড়া, বিল পাড়া, থাংতু পাড়া, হেডম্যান পাড়া ও নতুন পাড়া। প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও এতদিন এসব এলাকায় কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। ফলে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর পড়াশোনা থেমে যেত।
এই চিত্র পাল্টাতে ২০১৯ সালে প্রয়াত জাহেদ আহমেদ টুটুল প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিন্দু বিদ্যানিকেতন’। প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত টুটুল গ্রামে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে গাছতলায় শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে সূচনা করেন বিদ্যালয়ের। এরপর স্থানীয়দের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে বিদ্যালয়টি।
বিন্দু বিদ্যানিকেতনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো আনন্দময় ও সৃজনশীল পাঠদান। এখানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা শিখছে প্রকৃতি পাঠ, চিত্রাঙ্কন, নাট্যকলার প্রাথমিক ধাপ, বুনন ও কৃষিকাজ। প্রতিদিনই কোনো না কোনো সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বন থেকে সংগ্রহ করা পাতা, ফুল, হলুদ বেটে তারা রং তৈরি করে আঁকছে নিজস্ব ক্যানভাসে। বিদ্যালয়ের চারপাশে থাকা প্রাকৃতিক বৃক্ষরাজির ভেতরে শিক্ষকেরা শেখাচ্ছেন গাছ চেনার কৌশল—যা পরিচিত ‘প্রকৃতি পাঠ’ নামে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজীব চক্রবর্ত্তী সংবাদমাধ্যম দৈনিক আজাদীকে  জানান, “শিক্ষার্থীদের জন্য বই, খাতা, কলম, পোশাক সবকিছুই বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিনের শপথ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রকৃতি রক্ষার বার্তা দেওয়া হয়। এখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষা পাশের জন্য নয়, বরং একজন সচেতন ও মানবিক নাগরিক হওয়ার শিক্ষাও নিচ্ছে।”
বর্তমানে বিদ্যালয়ে ৬১ জন শিক্ষার্থী ও ৫ জন শিক্ষক রয়েছেন। অধিকাংশ পরিবারই দরিদ্র হওয়ায় শিক্ষার্থীদের উপজেলা সদরে গিয়ে পড়াশোনার সুযোগ হয় না। তাই বিদ্যালয়েই সেলাই, কৃষিকাজসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকে জড়িত চিকিৎসক ও পরিচালনা কমিটির সদস্য ডা. সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, “জাহেদ আহমেদ টুটুল আধুনিক শিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে এই বিদ্যালয় শুরু করেছিলেন। আজ শিক্ষানুরাগীদের সহায়তায় তার সেই স্বপ্ন এগিয়ে চলেছে।”
২০২১ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিষ্ঠাতা টুটুলের মৃত্যুর পর বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে প্রায় ৩৪ জন শিক্ষানুরাগীর অর্থায়নে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস তহবিলে ২ লাখ টাকা সহায়তা প্রদান করেছিলেন। তবে এখনো বিদ্যালয়ে পানির ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে, যা শিক্ষাদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
প্রান্তিক ও পাহাড়ি জনপদের শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ‘বিন্দু বিদ্যানিকেতন’ যেন সত্যিকারের আশার এক কেন্দ্রবিন্দু। শহরের গণ্ডির বাইরে এমন সৃজনশীল ও মানবিক শিক্ষার উদ্যোগ এখন এক অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠেছে। প্রয়োজন শুধু আরও সমর্থন ও সহযোগিতা—যাতে এই শিক্ষার আলো আরও অনেক পাহাড়ি শিশুর ভবিষ্যৎ আলোকিত করতে পারে।

-পার্বত্য সময়