আয়তনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জেলা রাঙ্গামাটি। পাহাড়, নদী ও দুর্গম জনপদের এই জেলাতেই জাতীয় সংসদের আসন মাত্র একটি- রাঙ্গামাটি (২৯৯)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই একক আসন ঘিরে জমে উঠেছে বহুমুখী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

৬ হাজার ১১৬ দশমিক ১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাঙ্গামাটিতে রয়েছে ১০টি উপজেলা, ৫০টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা। জেলার মোট জনসংখ্যা ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৬ জন। নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১ হাজার ৯৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫৫৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ৩৯৯ জন। আগের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটার বেড়েছে ২৭ হাজার ৫৯৮ জন।

জেলায় ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২১৩টি এবং বুথ রয়েছে ৯৯৩টি। দুর্গমতার কারণে আগের নির্বাচনে ১৮টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছিল। এবারও নিরাপত্তা ও যাতায়াত বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে রাঙ্গামাটি আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এ আসনে পাঁচবার আওয়ামী লীগ, একবার বিএনপি এবং একবার আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) সমর্থিত প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় এই আসনের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জনসংহতির প্রার্থীর মধ্যে। একই সঙ্গে জামায়াত ইসলামীও নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে চায়।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলটি এই আসন পুনরুদ্ধারে ব্যাপক প্রচারণায় নেমেছে। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন দীপেন দেওয়ান।

তিনি বলেন, ‘রাঙ্গামাটির মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। আমরা ঘরে ঘরে যাচ্ছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলছি। বিএনপি ক্ষমতায় এলে পাহাড় ও সমতলের সকল মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।’

বিএনপির দাবি, পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠী মিলিয়ে তাদের একটি বড় ভোটব্যাংক রয়েছে, যা এবার ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ভোটের হিসাব যারা শেষ মুহূর্তে বদলে দিতে পারেন, সেই আঞ্চলিক শক্তি হলো সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি- জেএসএস (সন্তু)। সংগঠনটির প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেছিলেন।

গত ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তির বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে ঊষাতন তালুকদার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনসংহতি অংশ নেবে। তবে এখনো মাঠপর্যায়ে তাদের দৃশ্যমান প্রচারণা চোখে পড়ছে না।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পাহাড়ি ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো জনসংহতির প্রতি অনুগত। ফলে শেষ মুহূর্তে সংগঠনটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।

এই আসনে জামায়াত ইসলামী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে। দলের প্রার্থী জেলার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোখতার আহম্মদ। অতীতে এই আসনে জামায়াত উল্লেখযোগ্য সাফল্য না পেলেও এবার দলটি নিজেদের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

অ্যাডভোকেট মোখতার আহম্মদ বলেন, ‘জনগণ যদি আমাদের সুযোগ দেয়, তাহলে পাহাড়ি ও সমতলের মানুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না।’

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জেলা সভাপতি জসিম উদ্দিন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ভোটের মাঠে তারা ভালো সাড়া পাচ্ছেন।

বাম ঘরানার রাজনীতিতে বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির জেলা সাধারণ সম্পাদক জুঁই চাকমা গণতন্ত্র মঞ্চের প্রার্থী হিসেবে কোদাল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তিনি দুর্গম কেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হিসেবে প্রিয় চাকমা শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

রাঙ্গামাটির রাজনীতিতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমীকরণ বদলে যাওয়ার নজির আছে। পাহাড়ি বাস্তবতা, আঞ্চলিক রাজনীতি ও জাতীয় দলের কৌশল- সব মিলিয়ে এই আসনের ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। তবে একক আসন হওয়ায় রাঙ্গামাটির ভোটযুদ্ধ এবারও জাতীয় রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।