বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদে এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৮০০ ফুট উচ্চতায় নির্মিত হচ্ছে এক হাজার ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্ত সড়ক’, যা শুধু দুর্গম জনপদের বাসিন্দাদের জন্য সহজ যোগাযোগ নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য, পর্যটন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে।
এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড, যার আওতায় ইতোমধ্যে প্রথম ধাপের ৩১৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় ৩,৪৮০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে রাজস্ব খাত থেকে। ২০৩৬ সালের মধ্যে বাকি কাজ সম্পন্ন হলে এটিই হবে দেশের দীর্ঘতম অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক।
সড়কটি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে শুরু হয়ে রাঙামাটির রাজস্থলী, বিলাইছড়ি, জুরাইছড়ি হয়ে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা ও রামগড় হয়ে শেষ হবে। এই সড়ক একদিকে যেমন বাংলাদেশকে সরাসরি যুক্ত করবে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে, তেমনি পাহাড়ি জনপদের ভেতরের দুর্গম গ্রামগুলোকেও সম্পৃক্ত করবে মূল যোগাযোগ ব্যবস্থায়।
ডায়মন্ড ম্রোং নামের এক কৃষক বলেন, “আগে অসুখ হলে হাসপাতালে নেওয়া যেত না। ফসল পচে নষ্ট হতো। এখন সড়ক হচ্ছে, স্কুল হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা পড়ছে। পাহাড় বদলাচ্ছে।”
দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকার দুর্গমতা ব্যবহার করে অস্ত্র, মাদক ও জঙ্গি কার্যক্রমের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গড়ে তুলেছিল একাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী। বিশেষ করে মিজোরাম ও আরাকান সীমান্তে থাকা অপরাধী চক্রগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে অনেক সময়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিমশিম খাচ্ছিল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সড়ক নির্মিত হলে নিরাপত্তা বাহিনী এখন সহজেই দুর্গম অঞ্চলগুলোতে পৌঁছাতে পারবে। এতে সন্ত্রাসীদের পক্ষে আর আশ্রয় গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
এছাড়াও দুর্গমতার সুযোগে পাহাড়ে মাদক চাষ যেমন পপি ও গাঁজা উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণের ফলে এই অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত সড়ক কেবল নিরাপত্তা নয়, এর মাধ্যমে দেশীয় পর্যটন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। আগে পাহাড়ের অনেক জায়গা ছিল মানুষের দৃষ্টির আড়ালে। এখন সড়ক হলে সেই স্থানগুলোতেও পর্যটক যাবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
সড়কটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ সরাসরি যুক্ত হবে ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের সঙ্গে। এ সংযোগের ফলে রামগড়-সাবরুম স্থলবন্দর, থেগামুখ, ঘুমধুম-মংডু চেকপোস্টের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য বহুগুণে বেড়ে যাবে।
সীমান্ত হাট কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী পণ্য পরিবহন সহজ হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমিয়ে এই রুটগুলো দ্বিতীয় বিকল্প হতে পারে।
যদিও সাধারণ মানুষ এই সীমান্ত সড়ককে মুক্তি ও সম্ভাবনার রাস্তায় দেখছে, কিছু উগ্র জাতিগোষ্ঠীনির্ভর গোষ্ঠী এটিকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। পাহাড়ের তথাকথিত অধিকারবাদী সংগঠনগুলো নানা বিভ্রান্তিকর প্রচার চালিয়ে সাধারণ পাহাড়িদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি করতে চাইছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং সেনাবাহিনীর অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল তারা সরাসরি পাচ্ছেন। ফলে এই বিভ্রান্তিকর প্রচারও আর কার্যকর হচ্ছে না।

-পার্বত্য সময়