আজ ১১ ডিসেম্বর, আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস। পাহাড় রক্ষায় টেকসই ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে বিশ্বজুড়ে পালিত হলেও, বাস্তবতার কঠিন প্রশ্নগুলো সবচেয়ে তীব্রভাবে প্রতিধ্বনিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামেই। পাহাড় কাটা, বন উজাড়, বেপরোয়া বসতি সম্প্রসারণ ও দখল সব মিলিয়ে রাঙ্গামাটির পাহাড়ি প্রতিবেশ আজ উদ্বেগজনক সংকটে।
দীর্ঘদিন ধরে কাপ্তাই লেক, সবুজ পাহাড় আর ঝরনাময় প্রকৃতির সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল নিজস্ব ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে অনন্য। কিন্তু জনসংখ্যার চাপ, পাহাড় কাটা এবং নির্বিচার বন নিধনের কারণে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা দ্রুত ভেঙে পড়ছে। বর্ষায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে, প্রাণহানি বাড়ছে, কমছে বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর আবাস।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় ধসের সবচেয়ে বড় শিকার শুধুমাত্র পরিবেশ নয়; কৃষি, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সীতারাম পাহাড়, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানসহ রাঙ্গামাটির বহু পাহাড় আজ তীব্র ঝুঁকির মুখে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় নিয়ে সরকারিভাবে কোনো পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা নেই। ফলে কোন পাহাড় কোন মাত্রায় ঝুঁকিতে, কোথায় অবৈধ বাসস্থান বা বালি–পাথর উত্তোলন চলছে, কোন ঢালে ভূমিধসের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি এসব বিষয়ে সঠিক তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাঙ্গামাটি পাবলিক কলেজের অধ্যাপক মুকুল কান্তি ত্রিপুরা এ প্রসঙ্গে বলেন, “পাহাড়ের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় সমীক্ষা অপরিহার্য। কাঠামোগত তথ্য না থাকলে পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হয় না। এই কাজটি এখনই জরুরি।”
বছরের পর বছর ধরে পরিবেশ রক্ষায় নানা নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবায়নে গাফিলতি থেকেই যাচ্ছে- মন্তব্য নাগরিক সমাজের।
রাঙ্গামাটি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, “পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়েই শিথিলতা উদ্বেগজনক। নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ সীমিত। পাহাড় হলো আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। এর অপরিকল্পিত ব্যবহার ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি।”
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি ভৌগোলিক কাঠামো বিবেচনায় বিল্ডিং কোড, স্থাপত্য নকশা এবং পরিবেশগত অনুমোদনের সঠিক প্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন।
পরিবেশ অধিদপ্তর রাঙ্গামাটির সহকারী পরিচালক মো. মোমিনুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ ৪১ হাজার হেক্টর পাহাড়ি ভূমি রয়েছে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে আছে প্রায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর পাহাড়ি অঞ্চল, যার ৮১ হাজার ৬০ হেক্টর উঁচু পাহাড়।
আগে এসব কার্যক্রম চট্টগ্রাম বিভাগীয় দপ্তর থেকে পরিচালিত হতো। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে রাঙ্গামাটি দপ্তরের মাধ্যমেই পাহাড় সংরক্ষণ কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে।
তার মতে, বর্তমান পর্যায়ে পাহাড় রক্ষায় সবচেয়ে জরুরি জনসচেতনতা, নিয়মিত মনিটরিং, এবং পরিবেশগত নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ।


