পাহাড়ে দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অনাস্থার যে দহনে সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক সম্প্রীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, সেই পরিস্থিতি বদলে দিতে মানিকছড়িতে এক ঐতিহাসিক সম্প্রীতি সমাবেশ। সোমবার (২৪ নভেম্বর) উপজেলা টাউন হলে সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে পাহাড়ের ১৪টি জাতিসত্তার হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে টাউন হল প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে ঐক্যের মঞ্চ। “মাতৃভূমি জিন্দাবাদ, পার্বত্য চৌদ্দ জাতি দীর্ঘজীবী হোক”—এ স্লোগানে মুখরিত সমাবেশে পাহাড়ের জনগণের শান্তি-অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রত্যয় জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়।

সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার থোয়াইচিং মং শাক। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি না ফেরার মূল কারণ হলো পরিকল্পিতভাবে পাহাড়ি-বাঙালি বিভাজন বজায় রাখা। একই রাষ্ট্রে বাস করেও আইনগত, সামাজিক ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য তৈরির কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনা বাড়ছে। তার ভাষ্য, অবাঙালি জনগোষ্ঠী সমতলে জমি কিনতে পারলেও বাঙালিদের পাহাড়ে জমি কেনা বাধাগ্রস্ত- এই বৈষম্য শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায়। তিনি পাহাড়ে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কারণে পাহাড়ে শান্তি নষ্ট হচ্ছে। সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে এ ধরনের সশস্ত্র কার্যক্রম দমনের মধ্য দিয়েই স্থায়ী শান্তির পথ সুগম হতে পারে।

সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের মুখপাত্র পাইশিখই মারমা। তিনি বলেন, পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি ও ১৪টি জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যেই সম্প্রীতি জোটের জন্ম। তিনি জানান, সংগঠনটি ইতোমধ্যে আট দফা দাবি নিয়ে পাহাড়জুড়ে পদযাত্রা শুরু করেছে, যা খুব দ্রুতই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে। তাদের লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পাহাড় গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেকে সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মনিরুজ্জামান, সদর ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন, ওলামা ঐক্য পরিষদের মাওলানা নাছির উদ্দিন, মুফতি মাইন উদ্দিন জামিল, মাওলানা গাজী আনোয়ার হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের মো. মোক্তাদীর হোসেন, সাংবাদিক আবদুল মান্নান, উপজেলা কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যজ চৌধুরী প্রমুখ। তারা জানান, পাহাড়ে বহুদিন ধরে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ইন্ধন দিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে। এই বিভাজন বজায় থাকলে উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং সমঅধিকার কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বক্তারা বলেন, অশান্তি ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ফলে পাহাড়ের মানুষ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তায় ভুগছে। পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংলাপ বাড়ানো, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা জাগানো এবং সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষকে সংঘাতের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে সিএইচটি সম্প্রীতি জোট নিয়মিত মাঠে কাজ করছে।

সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় সমতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, ভূমি ন্যায্যতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পাহাড়ে বসবাসরত প্রত্যেক নাগরিককে ‘সমান বাংলাদেশি’ পরিচয়ের ভিত্তিতে দেখতে হবে। বিভাজন নয়- ঐক্যই হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তির ভিত্তি।