ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্প্রতি একটি আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা ও বাস্তবতার নিরিখে ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি বলেছেন, "পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণের বিষয়ে রাজনীতিবিদ, আমলা এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য আছে"। এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে তার এই বক্তব্য কেবল অবিবেচক নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই প্রতীয়মান হয়।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের অখণ্ড অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম। এই অঞ্চল নিয়ে অতীতে দীর্ঘকাল ধরে সংঘাত চলেছে, যার পরিণতিতে ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তির পর সেনাবাহিনী এই অঞ্চলে শান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী হামলা, চাঁদাবাজি ও অপহরণের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছে সেনাবাহিনী। অথচ ড. ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে সেনাবাহিনীকে কার্যত 'অধিকার হরণকারী শক্তি' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা রাষ্ট্রবিরোধী প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছু নয়।
এতদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে 'আদিবাসী' শব্দটি নিয়ে যে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, সেখানেও তিনি ইন্ধন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানে 'আদিবাসী' নয়, 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। একে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে বারবার চাপে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছে। অথচ টিআইবির মতো একটি আন্তর্জাতিক এনজিওর শীর্ষকর্তা হিসেবে তার উচিত ছিল এ নিয়ে স্পষ্টতা আনা, বিভ্রান্তি নয়। তিনি বরং বলেছেন, আদিবাসী শব্দের অর্থ নিয়ে গবেষণা দরকার। প্রশ্ন হলো, এটি কি তার আসল উদ্দেশ্য, না কি 'আদিবাসী স্বীকৃতি'র মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের ছাতার নিচে একটি ভূখণ্ড আলাদা করার পথে রাষ্ট্রকে ঠেলে দেওয়া?
ড. ইফতেখারুজ্জামানের আরও এক গুরুতর অভিযোগ ছিল- পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক উপস্থিতির কারণে পরিস্থিতি শান্ত নয়। প্রশ্ন হলো, তাহলে কি তিনি চান—সেনা ক্যাম্প তুলে নেওয়া হোক? ইতিমধ্যে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী তৎপরতা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা এবং আরাকান আর্মির উপস্থিতি বেড়েছে। বান্দরবানের থানচি ও রুমার দুর্গম এলাকাগুলোতে সেনা শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কার্যত 'রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র' গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ এসব নিয়ে তার কোনও মন্তব্য ছিল না। তার বক্তব্যে কেবল সেনাবাহিনী নিয়ে অসন্তোষের সুর চড়িয়েছেন!
তার মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পার্বত্য অঞ্চলে মৌলিক কিছু উদ্যোগ নেবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু তিনি যেভাবে বলেছেন- "সরকারের পেছনে থাকা শক্তি আদিবাসী শব্দ গ্রহণ করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে"—এ বক্তব্য স্রেফ কূটনৈতিক কৌশলে মোড়ানো বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টা। যেন সরকার কোনো দলবিশেষের প্রতিনিধি, আর জনগণ আলাদা কিছু। এমন বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তিকর এবং একটি বিদেশি সাহায্যনির্ভর এনজিওর নির্বাহী প্রধানের মুখে এমন বক্তব্য আসা নীতিগতভাবে গুরুতর উদ্বেগজনক।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু বছর ধরে যেসব বাঙালি পরিবার বৈধভাবে বসবাস করছেন, তাদের নিয়ে তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। এইসব পরিবার গত তিন দশকে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতিত, গৃহচ্যুত ও নিহত হয়েছে। তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগানো হয়েছে, শস্য ও গবাদিপশু লুট হয়েছে। এসব নিয়ে ইফতেখারুজ্জামানের 'স্বচ্ছতার দৃষ্টিভঙ্গি' কোথায়?
সবশেষে বলতেই হয়, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল একটি আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থার কাজ হওয়া উচিত রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতি দমন- কিন্তু তা নয়, বরং দেখা যাচ্ছে সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্ব রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠীর প্রপাগান্ডার ভাষা ব্যবহার করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা যেমন জটিল, তেমনই স্পর্শকাতর। এখানে পক্ষপাতমূলক বিবৃতি শুধু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে না, বরং চুক্তি বাস্তবায়নের পথকে আরও কঠিন করে তোলে।
বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রে সব নাগরিকের অধিকার আছে- বাঙালি হোক কিংবা চাকমা, মারমা, গারো। কিন্তু সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে কারও পক্ষাবলম্বন করে অন্যকে 'দখলদার' বানানোর যে খেলা চলছে, তা থামানো এখন সময়ের দাবি।
পার্বত্য শান্তি চাই, প্রোপাগান্ডা নয়। সবার জন্য নিরাপত্তা চাই, নির্বাচিত গোষ্ঠীর জন্য নয়। আর স্বার্থনির্ভর এনজিওর ভাষায় নয়, চাই বাস্তবতার নিরিখে ন্যায়বিচার।
-রিয়াজুল ইসলাম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট


