পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। বিশেষ করে বান্দরবানের রুমা উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান উমেচিং মারমার সম্ভাব্য প্রার্থিতা ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। রাজনৈতিক আদর্শ, ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক এবং পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা সব মিলিয়ে এক জটিল সমীকরণের মুখে দাঁড়িয়েছেন এই নারী নেত্রী।

রাজনৈতিক আদর্শ ও ইউপিডিএফ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
উমেচিং মারমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই উগ্রপন্থী পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট -ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ছাত্রজীবনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) সক্রিয় নেত্রী থাকাকালীনই তিনি এই আদর্শের সাথে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে ইউপিডিএফ-এর প্রকাশ্য সমর্থনে তিনি রুমা উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার সাবেক স্বামী উশেপ্রু মারমাও ছিলেন ইউপিডিএফের প্রভাবশালী কমান্ডার ও গুইমারা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন কট্টর ইউপিডিএফ অনুসারী জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করলে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের শান্তি প্রক্রিয়া ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিতর্ক
প্রার্থিতার এই দৌড়ে উমেচিংয়ের ব্যক্তিগত জীবনও এখন জনসমক্ষে। অভিযোগ রয়েছে, রুমা উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান থাকাকালীন এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাথে সম্পর্কের জেরে তার প্রথম সংসার ভেঙে যায়। পরবর্তীতে তিনি সান ইয়াত সেন তালুকদারকে বিয়ে করেন, যা নিয়ে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের সামাজিক মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সান ইয়াত সেনের আগের স্ত্রী ও সন্তান থাকা সত্ত্বেও সামাজিক রীতি অমান্য করে এই বিয়ে সম্পন্ন হওয়ায় তারা এক সময় সামাজিক চাপের মুখে পড়েন। বর্তমানে তারা খাগড়াছড়ি ছেড়ে বান্দরবানে বসবাস করছেন।

শাশুড়ি নমিতা চাকমার বিতর্কিত ভূমিকা
উমেচিংয়ের বর্তমান শাশুড়ি নমিতা চাকমার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, নমিতা চাকমা কট্টর বাঙালি বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত এবং বিভিন্ন সময় সভা-সমাবেশে তার বক্তব্যে উগ্র সাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। এমনকি তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও জেএসএসের মতো সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন একটি পরিবারের সদস্যের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও স্থানীয় শঙ্কা
বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে উমেচিং মারমা সংরক্ষিত আসনে অনেকটা এগিয়ে আছেন বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে। তবে এই ঘনিষ্ঠতা এবং সম্ভাব্য মনোনয়ন নিয়ে খোদ রাজনৈতিক মহলেই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সংবিধান-বিরোধী কিছু বক্তব্য ও অবস্থান সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

নাগরিক প্রতিক্রিয়া
পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, সংসদ সদস্যের মতো দায়িত্বশীল পদে এমন কাউকে মনোনয়ন দেওয়া উচিত নয় যার অতীত বিতর্কিত কিংবা যার রাজনৈতিক দর্শনে উগ্রবাদের ছাপ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বান্দরবানের এক প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা জানান, "পাহাড়ের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আমাদের এমন প্রতিনিধি প্রয়োজন যারা বৈষম্যহীন এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বিশ্বাসী। উগ্র রাজনৈতিক আদর্শের কেউ ক্ষমতায় এলে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়বে।"

জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সংরক্ষিত এই নারী আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন কার ভাগ্যে জোটে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে উমেচিং মারমাকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলো পাহাড়ের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।