২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময় মাঠের রাজনীতিতে অনুপস্থিত থাকা সমীরণ দেওয়ান দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামায় স্থানীয় রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। খাগড়াছড়ি বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্য, গত ১৭ বছর জেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমীরণ দেওয়ানের কার্যকর উপস্থিতি দেখা যায়নি।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া। তার বিপরীতে সমীরণ দেওয়ান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

সমীরণকে ঘিরে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ স্পষ্ট। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ধারণা, দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তিনি বিএনপির ভোটব্যাংকে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবেন না। তাদের মতে, শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের প্রার্থী ওয়াদুদ ভূঁইয়াই বিজয়ী হবেন।

খাগড়াছড়ি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আরিফ মোহাম্মদ জাহিদ বলেন, নতুন প্রজন্মের অনেক কর্মীই সমীরণ দেওয়ানকে মাঠের রাজনীতিতে কখনো দেখেনি। তিনি হঠাৎ এসে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। তার উদ্দেশ্য ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে ঠেকানো হলেও সেটি বাস্তবসম্মত নয়। এবারের নির্বাচনে পাহাড়ি ও বাঙালি- উভয় জনগোষ্ঠীর মানুষ ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ।

বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে খাগড়াছড়িতে বিএনপির নেতাকর্মীরা মামলা, গ্রেপ্তার ও নিপীড়নের শিকার হলেও সমীরণ দেওয়ান ছিলেন অনেকটাই আড়ালে। তারা দাবি করেন, ওই সময় তিনি খাগড়াছড়ি ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করতেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক মামলাও হয়নি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরার কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন সমীরণ দেওয়ান। সে নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা পান ১ লাখ ২২ হাজার ৭৫০ ভোট, আর সমীরণ দেওয়ান পান ৬৩ হাজার ৪৮ ভোট।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সমীরণ দেওয়ান বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হলেও ধানের শীষের জন্য তিনি বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নন। বরং পাহাড়ের একটি আঞ্চলিক সংগঠনের সমর্থন পাওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমার ভোটব্যাংকে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধর্মজ্যোতি চাকমা ‘ঘোড়া’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি এর আগে দীঘিনালা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছার বলেন, দলের মনোনয়ন না পেয়ে সমীরণ দেওয়ান বিদ্রোহী হয়েছেন। গত ১৭ বছর তিনি খাগড়াছড়িতে ছিলেন না। নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। ২০০৮ সালে নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি এলাকা ছাড়েন। নির্বাচনের সময় এলেই ‘বসন্তের কোকিল’ হয়ে হাজির হন।

তিনি আরও বলেন, ওয়াদুদ ভূঁইয়া কারাগারে থাকার কারণে ২০০৮ সালে সমীরণ বিএনপির মনোনয়ন পেলেও বিপুল ভোটে পরাজিত হন। এরপর থেকে তাকে আর কোনো দলীয় কর্মসূচিতে দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে সমীরণ দেওয়ান বলেন, ওয়াদুদ ঠেকানো আমার কোনো মিশন নয়। আমরা একসময় একই দলে রাজনীতি করেছি, এখনো বিএনপিতেই আছি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী নির্মল কান্তি দাশ বলেন, গত ১৭ বছরে সমীরণ দেওয়ানের জনসম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন আছে। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে জনগণের সুখ-দুঃখে তার উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও তার কোনো ভূমিকা ছিল না।

তিনি আরও বলেন, ১৯৮৯ সালে বিশেষ ব্যবস্থায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৎকালীন স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান হন। জনসমর্থনের ভিত্তিতে তিনি ওই দায়িত্ব পাননি এবং তার মেয়াদকালে সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণে দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল না।

খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক অনিমেষ চাকমা রিংকু বলেন, সমীরণ দেওয়ান মূলত ১৯৮৯ সালে এরশাদের হাত ধরে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন। পরে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। তবে গত ১৭ বছর তাকে কার্যত আওয়ামী লীগঘেঁষা হিসেবেই দেখা গেছে।

সব মিলিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য এবং বিদ্রোহী প্রার্থিতা- এই তিন বিষয়কে ঘিরেই খাগড়াছড়ির রাজনীতিতে সমীরণ দেওয়ানকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।

 

সূত্র- বিডি নিউজ